অ্যানথ্রপিক কীভাবে বিশ্বের সবচেয়ে মূল্যবান AI কোম্পানি হয়ে উঠল ?
সূচনা: একটি ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত থেকে জন্ম
২০২১ সালের জানুয়ারিতে, OpenAI-এর শীর্ষস্থানীয় গবেষক দল একটি অভাবনীয় সিদ্ধান্ত নেয় — তারা কোম্পানি ছেড়ে দিয়ে নিজেদের নতুন প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। এই দলের নেতৃত্বে ছিলেন সহোদর ভাই-বোন দারিও আমোদেই (Dario Amodei) এবং দানিয়েলা আমোদেই (Daniela Amodei)। দারিও ছিলেন OpenAI-এর গবেষণা বিভাগের ভাইস প্রেসিডেন্ট, আর দানিয়েলা ছিলেন সেফটি ও পলিসি বিভাগের ভাইস প্রেসিডেন্ট। তাদের সাথে যোগ দেন আরও কয়েকজন সিনিয়র গবেষক — জ্যারেড কাপলান, জ্যাক ক্লার্ক, ক্রিস ওলাহ, বেন ম্যান, স্যাম ম্যাককান্ডলিশ এবং টম ব্রাউন।
তাদের প্রস্থানের পেছনে মূল কারণ ছিল AI নিরাপত্তা নিয়ে মতবিরোধ — ক্রমবর্ধমান শক্তিশালী মডেল দ্রুত মোতায়েন করার প্রতিযোগিতায় নিরাপত্তা গবেষণা পিছিয়ে পড়ছে, এই উদ্বেগ থেকেই জন্ম নেয় অ্যানথ্রপিক।
প্রতিষ্ঠা ও প্রাথমিক যাত্রা
অ্যানথ্রপিককে একটি পাবলিক বেনিফিট কর্পোরেশন (PBC) হিসেবে গঠন করা হয় — অর্থাৎ এটি লাভজনক প্রতিষ্ঠান হলেও আইনগতভাবে জনস্বার্থে কাজ করতে বাধ্য। সান ফ্রান্সিসকো-ভিত্তিক এই কোম্পানি ২০২১ সালের মে মাসে তাদের প্রথম ফান্ডিং রাউন্ডে ১২৪ মিলিয়ন ডলার সংগ্রহ করে, যেখানে বিনিয়োগকারী ছিলেন স্কাইপ-প্রতিষ্ঠাতা ইয়ান তালিন, ফেসবুকের দুস্তিন মস্কোভিৎজ এবং গুগলের এরিক স্মিট।
অ্যানথ্রপিকের গবেষণার কেন্দ্রবিন্দু ছিল তিনটি স্তম্ভ:
কনস্টিটিউশনাল AI — একটি প্রশিক্ষণ পদ্ধতি যেখানে লিখিত নীতিমালা, মডেল-জেনারেটেড সমালোচনা এবং AI ফিডব্যাক ব্যবহার করে মডেলের আচরণ গঠন করা হয়
ইন্টারপ্রিটেবিলিটি — নিউরাল নেটওয়ার্কের অভ্যন্তরীণ কার্যকলাপ বোঝার গবেষণা
রেসপন্সিবল স্কেলিং — মডেলের সক্ষমতা বাড়ার সাথে সাথে অতিরিক্ত মূল্যায়ন ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা যুক্ত করার নীতি
Claude-এর আত্মপ্রকাশ এবং বিনিয়োগের জোয়ার
২০২২ সালে অ্যানথ্রপিক ৫৮০ মিলিয়ন ডলারের সিরিজ B ফান্ডিং সংগ্রহ করে, এবং ২০২৩ সালের মার্চে জনসাধারণের জন্য Claude AI উন্মুক্ত করে। এই সময়েই Amazon থেকে ৪ বিলিয়ন ডলার এবং Google থেকে ২ বিলিয়ন ডলারের প্রতিশ্রুতি আসে।
২০২৪ সালে Claude 3 সিরিজ (Opus, Sonnet, Haiku) প্রকাশিত হয়, এবং Amazon-এর মোট বিনিয়োগ ৮ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়। পরবর্তীতে Amazon সর্বোচ্চ ৩৩ বিলিয়ন এবং Google সর্বোচ্চ ৪৩ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দেয়, যদিও কোনো প্রতিষ্ঠানেরই বোর্ডে ভোটাধিকার নেই — উভয়ই সংখ্যালঘু শেয়ারহোল্ডার হিসেবে থেকে যায়।
২০২৫ সালে Claude 4 সিরিজ প্রকাশের পর কোম্পানির মূল্যায়ন দাঁড়ায় প্রায় ১৮৩ বিলিয়ন ডলার, আর ২০২৬ সালের মে নাগাদ তা বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ৯৬৫ বিলিয়ন ডলারে — যা অ্যানথ্রপিককে বিশ্বের সবচেয়ে মূল্যবান বেসরকারি AI কোম্পানিগুলোর একটিতে পরিণত করে।
IPO এবং ২ ট্রিলিয়ন ডলারের লক্ষ্য
২০২৬ সালের জুনে অ্যানথ্রপিক গোপনীয়ভাবে SEC-এর কাছে S-1 ফাইলিং জমা দেয়, এবং সেপ্টেম্বরে জানা যায় তারা Nasdaq-এ তালিকাভুক্তির পরিকল্পনা করছে। সেকেন্ডারি মার্কেটে শেয়ার বেচাকেনায় ইতিমধ্যে তাদের মূল্যায়ন বেড়ে ১.০৫ থেকে ১.৫ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে বলে জানা গেছে। অক্টোবর ২০২৬-এ পরিকল্পিত এই IPO-তে Morgan Stanley, Goldman Sachs এবং JPMorgan-এর নেতৃত্বে অ্যানথ্রপিক ২ ট্রিলিয়ন ডলার বা তারও বেশি ভ্যালুয়েশন লক্ষ্য করছে — যা বাস্তবায়িত হলে এটি হবে Elon Musk-এর SpaceX-এর ১.৭৫ ট্রিলিয়ন ডলার লিস্টিংকেও ছাড়িয়ে ইতিহাসের অন্যতম বৃহত্তম প্রযুক্তি IPO।
এই উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রার পেছনে রয়েছে কোম্পানির দ্রুত বর্ধনশীল রাজস্ব। ২০২৬ সালের জুলাই নাগাদ তাদের annualized revenue run rate দাঁড়ায় প্রায় ৬৫ বিলিয়ন ডলারে (২০২৫ সালের শেষে যা ছিল মাত্র প্রায় ৯ বিলিয়ন ডলার), এবং ব্যাংকাররা ২০২৮ সালের প্রজেক্টেড রেভিনিউ (~১৯০-২০০ বিলিয়ন ডলার) এর ভিত্তিতে এই মূল্যায়ন নির্ধারণ করছে। উল্লেখযোগ্য যে, ২০২১ সাল থেকে মাত্র পাঁচ বছরে কোম্পানির মূল্যায়ন প্রায় ১,৫০০ গুণেরও বেশি বেড়েছে — ৬২৩ মিলিয়ন ডলার থেকে ৯৬৫ বিলিয়ন ডলারে।
গভর্নেন্স: লং-টার্ম বেনিফিট ট্রাস্ট
অ্যানথ্রপিকের একটি অনন্য বৈশিষ্ট্য হলো এর Long-Term Benefit Trust (LTBT) — স্বতন্ত্র ট্রাস্টিদের সমন্বয়ে গঠিত একটি গভর্নেন্স বডি, যাদের বোর্ড সদস্য নির্বাচন বা অপসারণের বিশেষ ভোটাধিকার রয়েছে। এর উদ্দেশ্য হলো, কোনো বিনিয়োগকারী যেন কোম্পানির নিয়ন্ত্রণ নিতে না পারে এবং মিশন যেন অটুট থাকে।
বর্তমান অবস্থা: প্রতিযোগিতা ও নীতির টানাপোড়েন
২০২৬ সালের প্রথমার্ধে অ্যানথ্রপিক এক গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে দাঁড়িয়েছে। ফেব্রুয়ারিতে কোম্পানি তাদের মূল "Responsible Scaling Policy" শিথিল করে একটি নমনীয় কাঠামোতে রূপান্তরিত করে — এই সিদ্ধান্ত অনেকের কাছে বিতর্কিত হয়ে ওঠে, কারণ অ্যানথ্রপিক নিজেকে "soul-driven" AI কোম্পানি হিসেবে পরিচয় দিয়ে এসেছিল। কোম্পানি জানায়, দ্রুত বর্ধনশীল বাজারে প্রতিযোগিতা টিকিয়ে রাখতেই এই পরিবর্তন প্রয়োজন হয়েছে, তবে তারা নিয়মিত বিরতিতে ঝুঁকি প্রতিবেদন প্রকাশের অঙ্গীকার করেছে।
সাম্প্রতিক সময়ে অ্যানথ্রপিক তাদের RSP সংস্করণ ৩.০ প্রকাশ করেছে, যেখানে "Frontier Safety Roadmap" এবং নিয়মিত "Risk Report" প্রকাশের কথা বলা হয়েছে। ২০২৬ সালের আগস্টে প্রকাশিত সর্বশেষ ঝুঁকি প্রতিবেদনে কোম্পানির মডেলগুলোর ঝুঁকি মূল্যায়ন এবং প্রস্তুতির বিস্তারিত বিবরণ দেওয়া হয়েছে।
এই সপ্তাহেই (সেপ্টেম্বর ২০২৬) দারিও আমোদেই এক প্রবন্ধে সতর্ক করে বলেছেন, আগামী ৬ থেকে ১২ মাসের মধ্যে AI সিস্টেম এমন পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে যেখানে তা ইন্টারনেট দখল করার মতো ক্ষমতা অর্জন করতে পারে। তিনি AI শিল্পকে "পেসিং দ্য ফ্রন্টিয়ার" নীতি গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন — অর্থাৎ, নিরাপত্তা ব্যবস্থা যাতে সক্ষমতার সাথে তাল মিলিয়ে চলতে পারে। একইসাথে জানা গেছে, অ্যানথ্রপিক, OpenAI এবং Google-এর নেতারা একটি নতুন যৌথ AI সেফটি সংস্থা গঠনের বিষয়ে আলোচনা করছেন।
গবেষণা প্রকাশ: কারা, কীভাবে
অ্যানথ্রপিকের গবেষণা মূলত তাদের নিজস্ব গবেষক দল দ্বারা পরিচালিত ও প্রকাশিত হয় — যার মধ্যে রয়েছে ইন্টারপ্রিটেবিলিটি টিম (ক্রিস ওলাহের নেতৃত্বে), সেফটি ও অ্যালাইনমেন্ট টিম, এবং পলিসি টিম। গবেষণা প্রকাশের প্রধান মাধ্যমগুলো হলো:
Anthropic-এর নিজস্ব ওয়েবসাইট ও নিউজরুম (anthropic.com/news) — নীতি পরিবর্তন, মডেল রিলিজ এবং নিরাপত্তা প্রতিবেদন প্রকাশের প্রধান চ্যানেল
Responsible Scaling Policy ডকুমেন্ট ও Frontier Safety Roadmap — যেখানে কোম্পানি তাদের ঝুঁকি মূল্যায়ন পদ্ধতি ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা প্রকাশ্যে শেয়ার করে
peer-reviewed একাডেমিক জার্নাল ও প্রি-প্রিন্ট সার্ভার — যেমন কনস্টিটিউশনাল AI সংক্রান্ত মূল গবেষণাপত্র ২০২২ সালে প্রকাশিত হয়
সিইও-র ব্যক্তিগত প্রবন্ধ — দারিও আমোদেই প্রায়ই তার নিজস্ব ওয়েবসাইটে দীর্ঘ নিবন্ধ প্রকাশ করেন, যেখানে তিনি শিল্পের প্রতি নীতিগত আহ্বান জানান
ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা
অ্যানথ্রপিক আগামী দিনগুলোতে যেসব ক্ষেত্রে মনোযোগ দিচ্ছে:
প্রভেবল ইনফারেন্স — মডেলের আউটপুট নির্দিষ্ট ওয়েটের সাথে যাচাইযোগ্যভাবে সংযুক্ত করার প্রযুক্তি, যার প্রোটোটাইপ ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরের মধ্যে তৈরির লক্ষ্য নির্ধারিত হয়েছে
সাইবার নিরাপত্তা — অত্যাধুনিক আক্রমণকারীদের হাত থেকে সিস্টেম রক্ষার দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা
শিল্প-ব্যাপী সমন্বয় — প্রতিযোগী কোম্পানিগুলোর সাথে মিলে একটি অভিন্ন নিরাপত্তা মান তৈরির প্রচেষ্টা
সরকারি সহযোগিতা — গণতান্ত্রিক ও অগণতান্ত্রিক উভয় সরকারের সাথে সমন্বিত নিরাপত্তা মানদণ্ড প্রতিষ্ঠার আহ্বান