AR News
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষণ · ১৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

২০২৬ সালেও উন্নত বিশ্ব থেকে কতটা পিছিয়ে বাংলাদেশ? গবেষণায় উঠে এলো আসল কারণ l

২০২৬ সালেও উন্নত বিশ্ব থেকে কতটা পিছিয়ে বাংলাদেশ? গবেষণায় উঠে এলো আসল কারণ l

২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ উন্নত বিশ্বের তুলনায় ঠিক কোথায় আছে, আর কেনই বা এই পিছিয়ে থাকা।

মানব উন্নয়ন সূচকে অবস্থান

জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি বা ইউএনডিপি প্রতি বছর একটা রিপোর্ট প্রকাশ করে, যার নাম মানব উন্নয়ন সূচক বা এইচডিআই। এই সূচকে আয়, শিক্ষা আর গড় আয়ু — এই তিনটি বিষয় মিলিয়ে দেশগুলোকে র‍্যাংকিং দেওয়া হয়। সবশেষ প্রতিবেদনে ১৯৩টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৩০তম। আগের বছরের তুলনায় এক ধাপ উন্নতি হয়েছে ঠিকই, কিন্তু এখনও বাংলাদেশ "মধ্যম মানব উন্নয়ন" শ্রেণিতেই রয়ে গেছে — যেখানে বেশিরভাগ উন্নত দেশ থাকে "অনেক উচ্চ মানব উন্নয়ন" শ্রেণিতে।

এই রিপোর্টে আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উঠে এসেছে — আয়ের বৈষম্য। দেশের সবচেয়ে গরিব ৪০ শতাংশ মানুষের কাছে আছে জাতীয় আয়ের মাত্র ২০ দশমিক ৪ শতাংশ, অথচ সবচেয়ে ধনী ১০ শতাংশের হাতে আছে ২৭ দশমিক ৪ শতাংশ আয়।

অর্থনৈতিক অবস্থান

বিশ্বব্যাংক প্রতি বছর জুলাই মাসে দেশগুলোর মাথাপিছু আয় অনুযায়ী একটা তালিকা প্রকাশ করে — নিম্ন, নিম্নমধ্যম, উচ্চমধ্যম আর উচ্চ আয়ের দেশ। ২১৮টি দেশ-অর্থনীতি নিয়ে করা এই সবশেষ তালিকায় বাংলাদেশ এখনও নিম্নমধ্যম আয়ের দেশের কাতারেই আছে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, জার্মানির মতো উন্নত দেশগুলো বহু আগেই উচ্চ আয়ের গণ্ডি পার করেছে।

এর মধ্যে একটা ভালো খবরও আছে — ২০২৬ সালের নভেম্বরে বাংলাদেশ জাতিসংঘের স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বেরিয়ে উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা পাবে। জাতিসংঘ এই উত্তরণের চূড়ান্ত অনুমোদনও দিয়ে দিয়েছে। কিন্তু সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ বা সিপিডি-র মতো গবেষণা প্রতিষ্ঠানের বিশ্লেষকরা বলছেন, দেশের অবকাঠামোগত দুর্বলতা, বৈষম্য আর আমলাতান্ত্রিক ধীরগতির কারণে এই অর্জনের সুফল সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাতে সময় লাগবে।

প্রবৃদ্ধির গতি ধীর

আন্তর্জাতিক রেটিং সংস্থা ফিচ রেটিংস-এর পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি হতে পারে মাত্র সাড়ে ৩ শতাংশের কাছাকাছি। আবার জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন সংস্থা আঙ্কটাডের পূর্বাভাস কিছুটা আশাব্যঞ্জক, প্রায় ৪ দশমিক ৬ শতাংশ। কিন্তু অর্থনীতিবিদরা বলছেন, ব্যাংকিং খাতে তারল্য সংকট, রাজনৈতিক অস্থিরতা আর বৈশ্বিক পরিস্থিতির কারণে এই প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা সহজ হবে না। তুলনায় উন্নত দেশগুলোর অর্থনীতি অনেক বেশি স্থিতিশীল, আর তাদের রাজস্ব-জিডিপি অনুপাতও অনেক বেশি — যেখানে বাংলাদেশ এখনও ১০ শতাংশের ঘরে পৌঁছানোর চেষ্টা করছে।

শান্তি ও স্থিতিশীলতার সূচক

গ্লোবাল পিস ইনডেক্স বা বৈশ্বিক শান্তি সূচক ২০২৬-এর প্রতিবেদন বলছে, দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলেই এবার সবচেয়ে বড় অবনতি হয়েছে শান্তির সূচকে — গড়ে ২ দশমিক ৩ শতাংশ খারাপের দিকে। এর পেছনে মূল কারণ অভ্যন্তরীণ অস্থিতিশীলতা আর সীমান্ত-উত্তেজনা। এই তালিকায় বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে চতুর্থ অবস্থানে আছে — যা মন্দ নয়, কিন্তু উন্নত বিশ্বের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার তুলনায় এখনও অনেকটাই পিছিয়ে।

কেন এই ব্যবধান?

বিশেষজ্ঞরা মূলত কয়েকটা কারণ চিহ্নিত করেন —

রাজনৈতিক অস্থিরতা আর নীতি বাস্তবায়নে দেরি

শিক্ষা খাতে পর্যাপ্ত বিনিয়োগের অভাব

আয় ও সম্পদ বণ্টনে তীব্র বৈষম্য

ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা আর তারল্য সংকট

আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, যা বিনিয়োগ আর সংস্কারের গতি কমিয়ে দেয়

তবে আশার দিকও আছে। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরলে, আর সুশাসন নিশ্চিত হলে বাংলাদেশ তার প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা কাজে লাগাতে পারবে বলে মনে করছেন গবেষকরা।

তথ্যসূত্র

জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (UNDP) — মানব উন্নয়ন প্রতিবেদন

বিশ্বব্যাংক — বার্ষিক আয় শ্রেণিবিন্যাস প্রতিবেদন (জুলাই ২০২৬)

ফিচ রেটিংস — বাংলাদেশ অর্থনৈতিক পূর্বাভাস

জাতিসংঘ বাণিজ্য ও উন্নয়ন সংস্থা (UNCTAD)

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (CPD)

ইনস্টিটিউট ফর ইকোনমিক্স অ্যান্ড পিস — গ্লোবাল পিস ইনডেক্স ২০২৬

আরও খবর পড়ুন