হুথিরা কতটা শক্তিশালী ?
ইয়েমেনের হুথি আন্দোলন (আনসারুল্লাহ) গত এক দশকে একটি স্বল্প-সংগঠিত বিদ্রোহী গোষ্ঠী থেকে মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম আলোচিত সামরিক শক্তিতে পরিণত হয়েছে। লোহিত সাগরে জাহাজে হামলা, ইসরায়েলে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন নিক্ষেপ, এবং সৌদি আরবের সঙ্গে দীর্ঘ সংঘাতের মধ্য দিয়ে তারা নিজেদের সক্ষমতা প্রমাণ করেছে। বিভিন্ন থিংক ট্যাংক, গোয়েন্দা সংস্থা ও জাতিসংঘের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে হুথিদের প্রকৃত শক্তি ও সীমাবদ্ধতা তুলে ধরা হলো।
জনবল ও সাংগঠনিক কাঠামো
মধ্যপ্রাচ্য ইনস্টিটিউটের (Middle East Institute) এক পর্যালোচনা অনুযায়ী, ২০২৫ সালের এপ্রিল নাগাদ হুথিদের সেনাসংখ্যা আনুমানিক ৩ লাখ ৫০ হাজার, যেখানে সৌদি-সমর্থিত সরকারি বাহিনীর সংখ্যা প্রায় ৩ লাখ। হুথি বাহিনী সাতটি অঞ্চলে বিভক্ত এবং তাদের নিজস্ব গোয়েন্দা শাখা (Security and Intelligence Service) রয়েছে, যা সামরিক গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহের পাশাপাশি আন্দোলনের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তাও দেখাশোনা করে।
তবে এই বাহিনীতে শিশু সৈনিক, জোরপূর্বক নিয়োগপ্রাপ্ত আফ্রিকান শরণার্থী এবং বিদেশি ভাড়াটে যোদ্ধাও রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। খাদ্য ও জ্বালানি আমদানির ওপর ইয়েমেনের নির্ভরতা তাদের সামরিক সক্ষমতার একটি বড় সীমাবদ্ধতা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন প্রযুক্তি: ইরানের ছায়া
হুথিদের সবচেয়ে আলোচিত শক্তি তাদের ব্যালিস্টিক ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র এবং আত্মঘাতী ড্রোন কর্মসূচি। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা সংস্থা (DIA) এবং জাতিসংঘের ইয়েমেন বিশেষজ্ঞ প্যানেলের একাধিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হুথিদের ব্যবহৃত প্রায় সব উন্নত অস্ত্রই ইরানি নকশার সঙ্গে সরাসরি সাদৃশ্যপূর্ণ। দ্য সেঞ্চুরি ফাউন্ডেশনের (The Century Foundation) একটি প্রতিবেদনে অস্ত্র বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণ তুলে ধরে বলা হয়েছে, হুথিদের প্রতিটি প্রধান ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ব্যবস্থার সঙ্গে ইরানি অস্ত্রভাণ্ডারে একটি সমতুল্য সংস্করণ পাওয়া যায়।
কনফ্লিক্ট আর্মামেন্ট রিসার্চের (Conflict Armament Research, CAR) সাম্প্রতিক এক অনুসন্ধানে লোহিত সাগরে আটক চালান থেকে ৮০০-র বেশি অস্ত্র যন্ত্রাংশ এবং ৭৫০ টন গোলাবারুদ শনাক্ত করা হয়েছে, যার মধ্যে জাহাজ-বিধ্বংসী, বিমান-বিধ্বংসী এমনকি পানির নিচে ব্যবহারযোগ্য অস্ত্রও রয়েছে। গবেষকদের ভাষ্যমতে, এসব অস্ত্র "ডিআইওয়াই কিট" আকারে খণ্ড খণ্ড করে পাঠানো হয়, যা শনাক্তকরণ এড়াতে সহায়ক — যদিও যন্ত্রাংশের মাত্র ৫ শতাংশ সরাসরি ইরান থেকে এসেছে, বাকিগুলো ১৬টি ভিন্ন দেশের সরবরাহ-শৃঙ্খল থেকে সংগৃহীত।
লোহিত সাগর ও বৈশ্বিক প্রভাব
ওয়েস্ট পয়েন্টের কমব্যাটিং টেররিজম সেন্টারের (CTC) বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০২৩ সালের অক্টোবরে গাজা যুদ্ধ শুরুর পর থেকে হুথিরা লোহিত সাগরে জাহাজে হামলা চালিয়ে বৈশ্বিক নৌ-বাণিজ্যে বড় ধাক্কা দিয়েছে — ২০২৪ সালে সুয়েজ খাল দিয়ে চলাচলকারী বাণিজ্যের প্রায় ৫০ শতাংশ ব্যাহত হয়েছিল বলে মধ্যপ্রাচ্য ইনস্টিটিউটের তথ্যে উঠে এসেছে। বিশ্লেষকদের মতে, বাব এল-মান্দেব প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ একটি তুলনামূলক দুর্বল অ-রাষ্ট্রীয় শক্তিকে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে তার সামরিক আকারের তুলনায় অনেক বেশি প্রভাব ফেলার সুযোগ করে দিয়েছে।
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল-ইরান সংঘাত শুরুর পর হুথিরা আবার ইসরায়েলের দিকে ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া শুরু করে এবং সৌদি আরবের ভূখণ্ডেও হামলার দাবি করে। সাম্প্রতিক প্রতিবেদন (সেপ্টেম্বর ২০২৬) অনুযায়ী সৌদি বিমান অভিযানে হুথিদের যথেষ্ট ক্ষতি হলেও তারা এখনো পাল্টা হামলা চালিয়ে যাচ্ছে।
প্রচলিত সামরিক শক্তির তুলনা: বাস্তব চিত্র
গ্লোবাল ফায়ারপাওয়ারের ২০২৬ সালের সূচকে ইয়েমেন ১৪৫টি দেশের মধ্যে ৯৮তম স্থানে রয়েছে। সৌদি আরবের সঙ্গে তুলনামূলক বিশ্লেষণে দেখা যায়, সৌদি আরবের প্রতিরক্ষা বাজেট (৮৮ বিলিয়ন ডলার) ইয়েমেনের বাজেটের (১.৭ বিলিয়ন ডলার) তুলনায় প্রায় ৫১ গুণ বেশি, এবং সৌদি আরবের সক্রিয় সেনাসংখ্যাও অনেক বেশি। প্রচলিত অস্ত্র ও প্রযুক্তির দিক থেকে হুথিদের কোনো সুসংগঠিত বিমানবাহিনী বা আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নেই।
তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, হুথিদের প্রকৃত শক্তি প্রচলিত সামরিক তুলনায় নয় — বরং সস্তা, প্রচুর পরিমাণে উৎপাদনযোগ্য এবং ধ্বংস করা কঠিন এমন ক্ষেপণাস্ত্র-ড্রোন মজুদে, যা দিয়ে তারা সৌদি তেল স্থাপনা, লবণাক্তকরণ কেন্দ্র ও বিমানবন্দরের মতো অবকাঠামোতে আঘাত হানতে সক্ষম। প্রতিটি প্রতিহত হামলার ব্যয় আক্রমণকারী অস্ত্রের তুলনায় বহুগুণ বেশি — এটিই তাদের "অসম যুদ্ধ" কৌশলের মূল ভিত্তি।
দুর্বলতা ও সীমাবদ্ধতা
মানবিক সংকট ও আমদানি-নির্ভরতা তাদের দীর্ঘমেয়াদি সামরিক সক্ষমতা সীমিত করে।
আন্তর্জাতিক অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা সরবরাহ ব্যবস্থাকে জটিল করলেও পুরোপুরি বন্ধ করতে পারেনি।
সুসংগঠিত বিমান শক্তি বা আধুনিক নৌবহরের অভাব রয়েছে।
ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ বিভক্তি (প্রতিদ্বন্দ্বী সরকার কাঠামো) তাদের জন্য সুবিধা হলেও অঞ্চলভেদে নিয়ন্ত্রণ সীমিত।
গবেষণা ও তথ্যসূত্র
এই প্রতিবেদনটি নিম্নলিখিত প্রতিষ্ঠান ও গবেষণার তথ্যের ভিত্তিতে তৈরি করা হয়েছে:
Middle East Institute (MEI) — হুথি আন্দোলনের সাংগঠনিক কাঠামো ও জনবল বিশ্লেষণ
Combating Terrorism Center, West Point (CTC Sentinel) — হুথিদের যুদ্ধ-কৌশল ও এক বছরের সংঘাত পর্যালোচনা
UN Panel of Experts on Yemen — অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘন ও ইরানি সরবরাহের প্রমাণ
US Defense Intelligence Agency (DIA) — ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র-ড্রোন প্রযুক্তির সঙ্গে তুলনামূলক বিশ্লেষণ
Conflict Armament Research (CAR) — লোহিত সাগরে আটক অস্ত্র চালানের ফরেনসিক অনুসন্ধান
The Century Foundation (TCF) — "From Smugglers to Supply Chains" শীর্ষক প্রতিবেদন
Global Fire Power (GFP) ও globalmilitary.net (ATLAS Index) — সামরিক শক্তি সূচক ও তুলনামূলক তথ্য