AR News
ভূরাজনীতি · ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

রাশিয়া, আমেরিকা, চীন — বিশ্বের তিন পরাশক্তিই আজ ভারতের দিকে হাত বাড়িয়ে আছে। কেন?

রাশিয়া, আমেরিকা, চীন — বিশ্বের তিন পরাশক্তিই আজ ভারতের দিকে হাত বাড়িয়ে আছে। কেন?

১. আমেরিকা কেন ভারতকে চায়?

আমেরিকার কাছে ভারতের গুরুত্ব মূলত একটাই বড় কারণে — চীন। নর্থইস্টার্ন ইউনিভার্সিটির পররাষ্ট্রনীতি বিশেষজ্ঞ ম্যাক্স আব্রাহামস "Rising Bharat" সম্মেলনে বলেছিলেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত দৃষ্টিভঙ্গি থেকে চীনকে প্রতিহত করার ক্ষমতার কারণে ভারতকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মনে করা হয়, এবং বর্তমান প্রশাসনের কাছে চীনের উত্থান ও সম্ভাব্য হুমকির চেয়ে ভূরাজনৈতিকভাবে বেশি গুরুত্বপূর্ণ আর কিছু নেই।

(northeastern)

তবে সম্পর্কটা সহজ নয়। এস্তোনিয়ার ICDS (International Centre for Defence and Security)-এর একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, ট্রাম্পের হোয়াইট হাউসে ফেরা ভারতকে তার বাইরের পরিবেশ নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে, এবং ২০২৫ সালের আগস্টে ঘোষিত ৫০% শুল্ক — যার মধ্যে রাশিয়ার তেল কেনার জন্য ২৫% জরিমানাও রয়েছে — ভারতের রপ্তানিকারকদের ওপর চাপ বাড়িয়েছে। (ICDS)

২. রাশিয়ার সাথে ভারতের সম্পর্ক কেন এত মজবুত?

আমেরিকার চাপ সত্ত্বেও ভারত রাশিয়াকে ছাড়েনি। বিশ্লেষক আন্দ্রেই কোরিবকোর মতে এর পেছনে মূল কারণ চীনের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা। তার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, সস্তা রুশ জ্বালানি ভারতের অর্থনৈতিক উত্থানকে ত্বরান্বিত করছে, এবং চীন ও পাকিস্তানের বিরুদ্ধে নিজেকে রক্ষা করতে ভারতের রাশিয়াকে প্রয়োজন। (Substack)

এশিয়া টাইমসের একটি প্রতিবেদনে এক আকর্ষণীয় পর্যবেক্ষণ আছে — যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলবিদরাও জানেন, ভারত যদি রাশিয়ার সাথে সম্পর্ক পুরোপুরি ছিন্ন করে, তাহলে রাশিয়ার কাছে চীনের অধীনস্থ হয়ে পড়া ছাড়া আর কোনো উপায় থাকবে না — যা যুক্তরাষ্ট্রের জন্যও ভালো নয়। (Asia Times)

৩. চীনের সাথে টানাপোড়েনের মাঝেও কেন সম্পর্ক জরুরি?

শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রখ্যাত আন্তর্জাতিক সম্পর্ক তাত্ত্বিক জন মিয়ারশাইমার সম্প্রতি (সেপ্টেম্বর ২০২৬) CNN-News18-এ আলোচনায় বলেছেন, ভারত তার যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও চীনের সাথে সম্পর্ককে আলাদা আলাদা ফাইল হিসেবে দেখতে পারে না — ভূগোলের কারণে চীন একটি অনিবার্য নিরাপত্তা উদ্বেগ, রাশিয়ার সাথে ঐতিহাসিক-সামরিক সম্পর্ক এখনো গুরুত্বপূর্ণ, আবার অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত স্বার্থ ভারতকে যুক্তরাষ্ট্রের দিকে টানছে। (Substack)

The National Interest পত্রিকার এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মে মাসে বেইজিংয়ে ট্রাম্প-শি জিনপিং শীর্ষ বৈঠকের পর যুক্তরাষ্ট্র-চীন-রাশিয়ার এক নতুন ত্রিভুজাকার বৈশ্বিক শক্তি বিন্যাস তৈরি হয়েছে, এবং এই বৈঠক ভারতের কৌশলগত স্বনির্ভরতা বজায় রাখার পছন্দকেই আরও জোরদার করেছে। (The National Interest)

৪. অর্থনীতিই কি আসল কারণ?

সংখ্যাগুলো দেখলেই বোঝা যায় কেন ভারত এত লোভনীয়:

IMF-এর হিসেবে ২০২৬ সালে ভারতের জিডিপি প্রবৃদ্ধি হবে প্রায় ৭%, যা একে বিশ্বের সবচেয়ে দ্রুত বর্ধনশীল বড় অর্থনীতি করে তুলেছে (তুলনায় যুক্তরাষ্ট্র ~২.২% ও চীন ~৪.৫%)।

জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক বিষয়ক বিভাগ (UN DESA)-এর জানুয়ারি ২০২৬-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভারত ২০২৬ সালে বিশ্বের সবচেয়ে দ্রুত বর্ধনশীল বড় অর্থনীতি হিসেবে থাকবে। (newsarenaindia)

বিশ্বব্যাংক, মুডি'জ ও RBI (রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়া)-ও একই ধরনের পূর্বাভাস দিয়েছে — ৬.৫%-৭.৬% প্রবৃদ্ধির মধ্যে।

RBI-এর মতে, ভারতের তরুণ ও ক্রমবর্ধমান শ্রমশক্তির সুফল ২০১৮ থেকে শুরু হয়ে ২০৫৫ সাল পর্যন্ত চলবে — অর্থাৎ বিশাল "ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড" এখনো সামনে। (indiaseatradenews)

৫. উপসংহার: ভারতের আসল কৌশল কী?

দিল্লি ভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান IMPRI-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভারতের অর্থনীতির প্রসার, বিশাল বাজার ও দক্ষ তরুণ জনগোষ্ঠীর কারণে বড় বড় শক্তিগুলোর কাছে এটি একটি ভূ-কৌশলগত পিভট হিসেবে থেকে যাবে, আর দিল্লির কাজ হলো চতুর কূটনীতির মাধ্যমে এই সুযোগগুলোকে কাজে লাগানো। (IMPRI)

সহজ কথায় — ভারত কারো "ব্লক"-এ পুরোপুরি যোগ দিচ্ছে না। বরং একে অপরের বিরুদ্ধে ভারসাম্য রেখে নিজের স্বার্থ আদায় করে নিচ্ছে। আর ঠিক এই কারণেই রাশিয়া, আমেরিকা, চীন — সবাই ভারতকে পাশে চায়।

আরও খবর পড়ুন