এআই দিয়ে বিশ্বজুড়ে হামলার ছক সশস্ত্র গোষ্ঠীদের ।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের ব্যবহার নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা মহলে। এত দিন প্রযুক্তিটির অপব্যবহার নিয়ে প্রধানত ভুয়া তথ্য ছড়ানো, অনলাইনে প্রচারণা এবং উগ্রবাদী মতাদর্শ ছড়িয়ে দেওয়ার আশঙ্কা সামনে থাকলেও, সাম্প্রতিক গবেষণায় সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর হামলার প্রস্তুতি ও যুদ্ধক্ষেত্রে এআই ব্যবহারের আরও গুরুতর চিত্র উঠে এসেছে।
গত ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ প্রকাশিত এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে আল জাজিরা জানায়, নাইজেরিয়ায় সক্রিয় বোকো হারামের দুই অংশের সাবেক সদস্যদের সাক্ষাৎকারভিত্তিক গবেষণায় এআই ব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া গেছে। গবেষকদের সঙ্গে কথা বলা ২৭ জন সাবেক সদস্যের কয়েকজন জানিয়েছেন, তাঁরা ChatGPT, Claude, Gemini, Grok, Meta AI এবং DeepSeek-এর মতো এআই চ্যাটবট থেকে প্রযুক্তিগত ও সামরিক বিষয়ে পরামর্শ নিয়েছেন।
কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যুক্ত গবেষণাটিতে উঠে এসেছে, এআইয়ের ব্যবহার শুধু তথ্য সংগ্রহের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। সাক্ষাৎকারে অংশ নেওয়া কয়েকজনের বর্ণনা অনুযায়ী, সশস্ত্র গোষ্ঠীর সদস্যরা যুদ্ধের প্রস্তুতি, অস্ত্রসংক্রান্ত সমস্যা সমাধান এবং অভিযান ব্যর্থ হওয়ার কারণ বুঝতেও এসব প্রযুক্তির সহায়তা নিয়েছেন। তবে এসব তথ্য মূলত সাবেক সদস্যদের সাক্ষাৎকারের ওপর নির্ভরশীল; প্রতিটি ঘটনার স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য সব ক্ষেত্রে পাওয়া যায়নি।
গবেষকদের উদ্বেগের একটি বড় কারণ হলো, সাধারণ সার্চ ইঞ্জিনের তুলনায় এআই চ্যাটবট ব্যবহারকারীর নির্দিষ্ট প্রশ্নের ভিত্তিতে উত্তর দিতে পারে। ফলে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী প্রযুক্তিটিকে ক্ষতিকর কাজে ব্যবহার করার চেষ্টা করলে ঝুঁকি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে। এ ধরনের অপব্যবহার ঠেকাতে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো নিরাপত্তাব্যবস্থা তৈরি করলেও, কিছু ব্যবহারকারী সেই বিধিনিষেধ এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে বলেও অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।
এআইয়ের অপব্যবহারের আশঙ্কা শুধু অস্ত্র বা সরাসরি হামলার প্রস্তুতিতেই সীমাবদ্ধ নয়। জাতিসংঘের সন্ত্রাসবিরোধী কমিটির নির্বাহী অধিদপ্তরের ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সহিংস উগ্রবাদী গোষ্ঠীগুলো প্রচারণা তৈরি, বিভিন্ন ভাষায় বার্তা ছড়ানো, নতুন সদস্য আকৃষ্ট করা এবং অর্থ সংগ্রহের মতো কাজেও এআই ব্যবহার করছে। এসব কার্যক্রম অনলাইনে দ্রুত ছড়িয়ে পড়লে নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর জন্য হুমকি শনাক্ত করা আরও কঠিন হতে পারে।
তবে এআই দিয়ে হামলার পরিকল্পনা করা হচ্ছে—এমন খবরের অর্থ এই নয় যে প্রযুক্তিটি নিজে থেকেই হামলা চালাতে পারে, কিংবা বিশ্বের সব সশস্ত্র গোষ্ঠী একইভাবে এটি ব্যবহার করছে। বরং মানুষের সিদ্ধান্ত ও বিদ্যমান সক্ষমতার সঙ্গে এআই যুক্ত হওয়ায় এর অপব্যবহারের ঝুঁকি বাড়ছে। প্রযুক্তিটির প্রকৃত প্রভাব নির্ধারণে আরও স্বাধীন গবেষণা, যাচাই করা তথ্য এবং বাস্তব ঘটনার বিশ্লেষণ প্রয়োজন।
প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের জন্য এখন বড় চ্যালেঞ্জ হলো, কীভাবে এআইয়ের বৈধ ব্যবহার অব্যাহত রেখে সন্ত্রাসবাদ, সহিংসতা ও অস্ত্র তৈরিতে এর অপব্যবহার ঠেকানো যায়। শুধু প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তাব্যবস্থা নয়, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, কার্যকর নজরদারি এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সক্ষমতাও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।
এআই মানুষের কাজ সহজ করার পাশাপাশি নতুন নিরাপত্তাঝুঁকিও তৈরি করছে। সেই ঝুঁকি মোকাবিলায় প্রযুক্তির উন্নয়নের সঙ্গে নিরাপত্তাব্যবস্থার সমানতালে এগিয়ে চলা এখন জরুরি।