স্মার্টফোনের শেষ যুগ? ২০২৬-২০৫০ প্রযুক্তির রোডম্যাপ ।
২০২৬ থেকে ২০৫০: মোবাইল প্রযুক্তির পরবর্তী ২৫ বছরের যাত্রা
আগামী পঁচিশ বছরে মোবাইল ফোন আজকের চেনা রূপ থেকে সম্পূর্ণ বদলে যেতে পারে — পকেটের কাঁচের স্ল্যাব থেকে চোখের চশমা, কানের ইয়ারপিস, এমনকি সরাসরি মস্তিষ্কের সাথে যুক্ত ডিভাইসে রূপান্তরিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক টেলিকম সংস্থা, প্রযুক্তি নির্মাতা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের প্রকাশিত রোডম্যাপ ও গবেষণাপত্র বিশ্লেষণ করে এই প্রতিবেদনে তিনটি ধাপে (২০২৬–৩০, ২০৩০–৪০, ২০৪০–৫০) সম্ভাব্য পরিবর্তনগুলো তুলে ধরা হলো।
ধাপ ১: ২০২৬–২০৩০ — ব্যাটারি বিপ্লব ও ৬জি-র ভিত্তি
কারা গবেষণা করছে: দক্ষিণ কোরিয়ার Samsung SDI, জাপান-ভিত্তিক Toyota, যুক্তরাষ্ট্রের QuantumScape এবং জার্মান-মার্কিন জোট Solid Power বর্তমানে সলিড-স্টেট ব্যাটারি প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করছে।
কী বদলাবে: Samsung SDI ২০২৬ থেকে ২০৪০ সাল পর্যন্ত প্রায় ১৭ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে এবং দক্ষিণ কোরিয়ার উলসান কারখানায় ২০২৭ সালের দ্বিতীয়ার্ধ থেকে সলিড-স্টেট ব্যাটারি বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরুর লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। এই ব্যাটারি বর্তমান লিথিয়াম-আয়ন প্রযুক্তির তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ শক্তি ঘনত্ব সরবরাহ করতে সক্ষম বলে জানা গেছে, যার ফলে ফোন কয়েকদিন পর্যন্ত চার্জ ছাড়া চলতে পারবে এবং চার্জিং সময় নাটকীয়ভাবে কমে আসবে।
একই সময়ে ৬জি নেটওয়ার্কের কাঠামো তৈরি হচ্ছে। জাতিসংঘের সংস্থা ITU-R (International Telecommunication Union – Radiocommunication Sector)-এর তত্ত্বাবধানে এবং 3GPP (3rd Generation Partnership Project)-এর প্রযুক্তিগত মান নির্ধারণ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ২০৩০ সালের মধ্যে ৬জি বাণিজ্যিকভাবে চালু হওয়ার প্রত্যাশা করা হচ্ছে। ITU-R-এর ভাষ্যমতে ৬জি হবে ইমারসিভ কমিউনিকেশন, AI-সংযুক্ত যোগাযোগ ও অতি-নির্ভরযোগ্য লো-লেটেন্সি সংযোগের যুগ। ফিনল্যান্ডের University of Oulu-র 6G Flagship প্রকল্প এবং ইউরোপের Hexa-X জোটও এই মান নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
ফোল্ডেবল স্মার্টফোনের বাজারও দ্রুত বাড়ছে — বাজার গবেষণা অনুযায়ী ২০২৭ সালের মধ্যে ফোল্ডেবল স্মার্টফোনের বৈশ্বিক বাজার প্রায় ৩ কোটি ইউনিটে পৌঁছাতে পারে, যা নমনীয় সলিড-স্টেট ব্যাটারির চাহিদাও বাড়িয়ে দেবে।
ধাপ ২: ২০৩০–২০৪০ — স্মার্ট গ্লাস ও পকেট থেকে মুক্তি
কারা গবেষণা করছে: Meta, IEEE Spectrum-এর প্রযুক্তি বিশ্লেষকরা, এবং বাজার গবেষণা সংস্থা Grand View Research ও Market Research Future।
কী বদলাবে: Meta-র প্রধান নির্বাহী মার্ক জাকারবার্গ প্রকাশ্যে আগামী দশকের মধ্যে স্মার্ট গ্লাস স্মার্টফোনকে অপ্রয়োজনীয় করে তুলবে বলে পূর্বাভাস দিয়েছেন, এবং এই লক্ষ্যে Meta ১০০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি বিনিয়োগ করেছে AR ও VR প্রযুক্তিতে। তবে বাস্তবতা কিছুটা মধ্যপন্থী — বিশ্লেষকদের পূর্বাভাস অনুযায়ী ২০৩০ সালের মধ্যে ৩০-৪০ শতাংশ ব্যবহারকারীর কাছে স্মার্ট গ্লাস প্রধান কম্পিউটিং যন্ত্র হয়ে উঠতে পারে, আর স্মার্টফোন পরিণত হবে ব্যাকআপ বা চার্জিং স্টেশনে।
Bloomberg-এর বিশ্লেষক মিং-চি কুও-এর পূর্বাভাস অনুযায়ী, স্মার্ট গ্লাস ২০৩৫ সালের মধ্যে স্মার্টফোনের বিক্রয় ছাড়িয়ে যেতে পারে, তবে স্মার্টফোন সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হবে না — বরং তা "পকেট AI হাব"-এ রূপান্তরিত হবে। AR/VR স্মার্ট গ্লাসের বৈশ্বিক বাজার ২০২৪ সালের ১৭.৮ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ২০৩৫ সালের মধ্যে প্রায় ৮৭.৭ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে বলে মার্কেট রিসার্চ ফিউচারের পূর্বাভাসে উঠে এসেছে।
এই দশকেই ৬জি নেটওয়ার্ক পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হয়ে যাওয়ার কথা, যা হলোগ্রাফিক কল, রিয়েল-টাইম অনুবাদ এবং নিরবচ্ছিন্ন AR অভিজ্ঞতাকে বাস্তবে রূপ দেবে।
ধাপ ৩: ২০৪০–২০৫০ — মস্তিষ্ক-কম্পিউটার সংযোগের যুগ
কারা গবেষণা করছে: Elon Musk-এর প্রতিষ্ঠান Neuralink, স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নায়ুবিজ্ঞানীরা, এবং বিভিন্ন নিউরোটেকনোলজি স্টার্টআপ।
কী বদলাবে: Neuralink বর্তমানে পক্ষাঘাতগ্রস্ত রোগীদের মস্তিষ্কের সংকেতের মাধ্যমে কম্পিউটার ও ফোন নিয়ন্ত্রণ করার প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করছে। ইলন মাস্ক নিজেই দাবি করেছেন যে ভবিষ্যতে ফোনের বদলে সরাসরি নিউরালিংকের মাধ্যমে যোগাযোগ হবে। বিশেষজ্ঞদের মতে এই প্রযুক্তির ২০৩৫ সালের পর স্মৃতি বৃদ্ধি, জ্ঞানীয় ক্ষমতা বৃদ্ধি এবং মস্তিষ্ক-থেকে-মস্তিষ্কে সরাসরি যোগাযোগের মতো প্রয়োগ সম্ভব হতে পারে — যদিও এগুলো এখনো মূলত তাত্ত্বিক পর্যায়ে।
এই ধাপে মোবাইল ডিভাইসের ধারণাটাই পাল্টে যেতে পারে — "ফোন" শব্দটি হয়তো আর কোনো হাতে-ধরা যন্ত্র বোঝাবে না, বরং শরীরে সংযুক্ত বা পরিধানযোগ্য এক নেটওয়ার্কের প্রান্তবিন্দু বোঝাবে। তবে এই প্রযুক্তি এখনো প্রাথমিক ক্লিনিক্যাল পরীক্ষার পর্যায়ে রয়েছে এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর অনুমোদন, নৈতিক প্রশ্ন ও ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা — এই সবকিছুর ওপর নির্ভর করছে বাস্তবে এর প্রয়োগের গতি।
সংক্ষেপে সময়রেখা
সময়কাল
প্রধান পরিবর্তন
সূত্র
২০২৬–২০৩০
সলিড-স্টেট ব্যাটারি, ৬জি স্ট্যান্ডার্ড চূড়ান্তকরণ, ফোল্ডেবল ফোনের বিস্তার
Samsung SDI, ITU-R, 3GPP
২০৩০–২০৪০
স্মার্ট গ্লাস প্রধান ডিভাইস হয়ে ওঠা, ৬জি পূর্ণ বাস্তবায়ন
Meta, Market Research Future, IEEE
২০৪০–২০৫০
মস্তিষ্ক-কম্পিউটার ইন্টারফেস, শরীর-সংযুক্ত কম্পিউটিং
Neuralink, একাডেমিক স্নায়ুবিজ্ঞান গবেষণা
দ্রষ্টব্য: ২০৩৫-পরবর্তী পূর্বাভাসগুলো মূলত বিশ্লেষক ও প্রযুক্তি নির্বাহীদের অনুমান-নির্ভর, প্রতিষ্ঠিত বৈজ্ঞানিক ঐকমত্য নয়। প্রযুক্তির প্রকৃত গতি নিয়ন্ত্রক অনুমোদন, ব্যবহারকারীর গ্রহণযোগ্যতা ও অপ্রত্যাশিত প্রযুক্তিগত বাধার ওপর নির্ভর করে বদলাতে পারে।