AR News
স্বাস্থ্য ও বিজ্ঞান · ৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

ক্যান্সারের ওষুধ কেন শরীরে কার্যকর হয় না? কেন কি বলছে গবেষণায় ।

ক্যান্সারের ওষুধ কেন শরীরে কার্যকর হয় না? কেন কি বলছে গবেষণায় ।

ক্যান্সার একটি একক রোগ নয়, বরং শতাধিক ভিন্ন ধরনের রোগের সমষ্টি — এই কারণেই একটি নির্দিষ্ট ওষুধ দিয়ে সব ধরনের ক্যান্সার সারানো সম্ভব হয় না। গবেষকরা বলছেন, চিকিৎসাবিজ্ঞানে বিপুল অগ্রগতি সত্ত্বেও ক্যান্সারের ওষুধ শরীরে কার্যকর না হওয়ার পেছনে রয়েছে বেশ কয়েকটি জটিল জৈবিক কারণ।

কেন ওষুধ কাজ করে না: মূল কারণগুলো

গবেষণায় দেখা গেছে, ক্যান্সার কোষ চিকিৎসার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ (resistance) গড়ে তোলে একাধিক উপায়ে। এর মধ্যে অন্যতম হলো কোষ থেকে ওষুধ বের করে দেওয়ার ক্ষমতা বৃদ্ধি, ওষুধ বিপাকে পরিবর্তন, ওষুধ ও লক্ষ্যকোষের মিথস্ক্রিয়ায় পরিবর্তন, কোষমৃত্যু এড়িয়ে যাওয়া এবং বিকল্প সিগন্যালিং পথ সক্রিয় হয়ে ওঠা। প্রাথমিক সাড়া পাওয়ার পর টিউমার কোষে প্রতিরোধ তৈরি হওয়াই ক্যান্সার রোগীর মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ, আর এই প্রতিরোধ কেমোথেরাপি, টার্গেটেড থেরাপি এবং সেলুলার থেরাপি—সব ধরনের চিকিৎসার বিরুদ্ধেই ঘটতে পারে।

একই রোগীর শরীরে একসঙ্গে একাধিক প্রতিরোধ প্রক্রিয়া সক্রিয় থাকতে পারে, যা সম্পূর্ণ আরোগ্য পাওয়া এবং রোগ পুনরায় ফিরে আসা ঠেকানো কঠিন করে তোলে।

শরীরের নিজস্ব "পাম্প সিস্টেম"

যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ক্যান্সার ইনস্টিটিউটের (NCI) গবেষক মাইকেল গটেসম্যান ও তাঁর দল তিন দশকেরও বেশি আগে আবিষ্কার করেন, ক্যান্সার কোষ প্রায়ই ABC ট্রান্সপোর্টার নামের একধরনের প্রোটিন বেশি মাত্রায় তৈরি করে, যা কোষের ভেতর থেকে ওষুধকে বের করে দেয়। রোগী চিকিৎসার প্রতি সংবেদনশীল অবস্থা থেকে প্রতিরোধী অবস্থায় চলে গেলে দেখা যায়, ক্যান্সার কোষ এই ট্রান্সপোর্টার প্রোটিন বেশি পরিমাণে তৈরি করতে শুরু করে। ফলে দেহে ওষুধ প্রবেশ করলেও তা কার্যকর মাত্রায় কোষের ভেতরে থাকে না।

এপিজেনেটিক পরিবর্তন

ডিএনএ কোড অপরিবর্তিত রেখেও কোষ জিন চালু-বন্ধ করতে পারে, একে বলে এপিজেনেটিক পরিবর্তন। এই পরিবর্তনগুলো বিপরীতমুখী (reversible) হওয়ায় সময়ের সঙ্গে কোষের আচরণও বদলাতে থাকে, যা দীর্ঘমেয়াদে ওষুধ প্রতিরোধ তৈরিতে ভূমিকা রাখে।

"লুকানো ভাণ্ডার" — লাইসোজোমে ওষুধ জমে থাকা

সম্প্রতি লন্ডন ইনস্টিটিউট অব মেডিক্যাল সায়েন্সেসের (LMS) গবেষকরা ম্যাস স্পেকট্রোমেট্রি ব্যবহার করে একটি নতুন কারণ চিহ্নিত করেছেন। গবেষণার প্রধান লেখক ও পোস্টডক্টরাল গবেষক ড. কারমেন রামিরেজ মনকায়োর নেতৃত্বে করা এই গবেষণায় দেখা গেছে, একই চিকিৎসা কিছু রোগীর ক্ষেত্রে ভালো কাজ করলেও অন্যদের ক্ষেত্রে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়— এটাই অনকোলজির অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ, কারণ ওষুধকে কার্যকর হতে হলে ক্যান্সার কোষে যথেষ্ট মাত্রায় জমা হতে হয়। তাঁদের গবেষণায় প্রতিটি কোষের স্তরে ওষুধ জমার পরিমাণে বিশাল তারতম্য দেখা যায়, যার পেছনে রয়েছে লাইসোজোম নামের কোষীয় অঙ্গাণু—এটি ওষুধকে জমা করে "ভাণ্ডার" হিসেবে কাজ করে এবং প্রয়োজনমতো ছেড়ে দেয়।

RAS-টার্গেটেড ওষুধকে ফাঁকি দেওয়ার নতুন কৌশল

মেমোরিয়াল স্লোন কেটারিং ক্যান্সার সেন্টারের (MSK) গবেষকরা ২০২৬ সালের মে মাসে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখিয়েছেন, ক্যান্সার কোষ কীভাবে RAS-টার্গেটেড "মলিকিউলার গ্লু" ওষুধকে ফাঁকি দেওয়ার নতুন কৌশল বের করে। একটি প্রক্রিয়ায় RAS জিনে সেকেন্ডারি মিউটেশন হয়ে ওষুধের সঙ্গে প্রোটিনের সংযোগ ক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়ে, আরেকটি প্রক্রিয়ায় BRAF জিনের মিউটেশনের ফলে RAF প্রোটিন জোড়া বেঁধে ওষুধকে কাজ করতে বাধা দেয়।

টিউমারের চারপাশের পরিবেশ ও ইমিউন সিস্টেম

ইমিউনোথেরাপি ক্লাসিক্যাল ওষুধ-প্রতিরোধ প্রক্রিয়া থেকে অনেকটাই মুক্ত হলেও টিউমারের বৈচিত্র্য ও ইমিউন সিস্টেমকে ফাঁকি দেওয়ার কারণে তা-ও অনেক সময় ব্যর্থ হয়। এ ছাড়া অন্ত্রের মাইক্রোবায়োম (গাট ব্যাকটেরিয়া) কীভাবে চিকিৎসার সাড়া প্রভাবিত করে, তা নিয়েও এখন ব্যাপক গবেষণা চলছে।

গবেষকরা কী পথে এগোচ্ছেন

বিজ্ঞানীরা এখন ন্যানোপার্টিকেল-ভিত্তিক ওষুধ সরবরাহ ব্যবস্থা, একাধিক ওষুধের সমন্বিত (কম্বিনেশন) থেরাপি এবং রোগীভিত্তিক বায়োমার্কার শনাক্ত করে ব্যক্তিগতকৃত চিকিৎসার দিকে এগোচ্ছেন। এমনকি এআই-নির্ভর কৌশলও এখন ওষুধ-প্রতিরোধ ঠেকানোর গবেষণায় ব্যবহৃত হচ্ছে।

মূল কথা হলো, ক্যান্সারের বিরুদ্ধে "একক জাদু-বুলেট" ওষুধ পাওয়ার সম্ভাবনা কম, কারণ প্রতিটি টিউমার—এমনকি একই রোগীর শরীরে থাকা টিউমারও—ভিন্ন ভিন্ন উপায়ে ওষুধকে প্রতিরোধ করতে শেখে। তাই প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ শনাক্তকরণ এবং একাধিক চিকিৎসা পদ্ধতির সমন্বয়ই এখন পর্যন্ত সবচেয়ে কার্যকর কৌশল বলে বিবেচিত হচ্ছে।

আরও খবর পড়ুন