AR News
স্বাস্থ্য ও বিজ্ঞান · ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

আফিম কতটা ভয়ংকর? কীভাবে তৈরি হয়,

আফিম কতটা ভয়ংকর? কীভাবে তৈরি হয়,

আফিম কতটা ভয়ংকর? কীভাবে তৈরি হয় এবং শরীরে কী করে

আফিম—শব্দটি শুনলেই অনেকের মনে মাদকাসক্তির কথা আসে। কিন্তু এই পদার্থের ইতিহাস শুধু মাদক হিসেবে নয়, চিকিৎসাবিজ্ঞানের সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িত।

আফিম থেকেই প্রাকৃতিকভাবে পাওয়া যায় মরফিন ও কোডিনের মতো গুরুত্বপূর্ণ অ্যালকালয়েড। তবে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া বা বিনোদনমূলকভাবে আফিম ব্যবহার করলে এটি গুরুতর আসক্তি, শারীরিক ক্ষতি এমনকি মৃত্যুর কারণ হতে পারে।

আফিম আসলে কী?

আফিম হলো Papaver somniferum, অর্থাৎ আফিম পপি গাছের অপরিপক্ব বীজফল থেকে বের হওয়া দুধের মতো আঠালো রস বা ল্যাটেক্স শুকিয়ে পাওয়া একটি মাদকদ্রব্য।

এই ল্যাটেক্সে অন্তত ২৫ ধরনের অ্যালকালয়েড পাওয়া যায়। এর মধ্যে রয়েছে মরফিন, কোডিন, থিবেইন, প্যাপাভেরিন ও নসক্যাপিন।

আফিম কীভাবে তৈরি হয়?

প্রাকৃতিকভাবে আফিম তৈরির প্রক্রিয়া শুরু হয় আফিম পপি গাছের বীজফল বা seed pod-এ।

গাছের অপরিপক্ব ফলের ভেতরের বিশেষ কোষে অ্যালকালয়েডসমৃদ্ধ ল্যাটেক্স জমা হয়। পরবর্তীতে এই ল্যাটেক্স সংগ্রহ ও শুকিয়ে যে কাঁচা পদার্থ পাওয়া যায়, সেটিই কাঁচা বা crude opium হিসেবে পরিচিত।

তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আছে—অবৈধভাবে আফিম উৎপাদনের ব্যবহারিক পদ্ধতি, নির্দিষ্ট সরঞ্জাম বা ধাপে ধাপে প্রক্রিয়া অনুসরণ করে কীভাবে এটি তৈরি করা যায়, সে ধরনের নির্দেশনা দেওয়া নিরাপদ নয়।

আফিমে কী থাকে?

আফিমের সবচেয়ে পরিচিত উপাদান হলো মরফিন।

এছাড়াও এতে থাকে কোডিন, থিবেইন, প্যাপাভেরিন ও নসক্যাপিনসহ বিভিন্ন অ্যালকালয়েড।

মরফিন ও কোডিনের মতো কিছু উপাদান চিকিৎসাবিজ্ঞানে ব্যথা নিয়ন্ত্রণসহ নির্দিষ্ট চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়। কিন্তু চিকিৎসায় ব্যবহারের জন্য এগুলো নিয়ন্ত্রিত ও নির্দিষ্ট মাত্রায় দেওয়া হয়। আফিমের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়।

কেন আফিম এত বিপজ্জনক?

আফিমের প্রধান বিপদগুলোর একটি হলো আসক্তি।

বারবার ব্যবহার করলে শরীর ও মস্তিষ্কে নির্ভরতা তৈরি হতে পারে। ফলে একজন ব্যক্তি ক্ষতিকর পরিণতি জানা সত্ত্বেও আবার আফিম গ্রহণের প্রবল তাগিদ অনুভব করতে পারেন।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বা WHO বলছে, ওপিওয়েডের অপব্যবহার ও দীর্ঘমেয়াদি অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার নির্ভরতা এবং অন্যান্য স্বাস্থ্য সমস্যার কারণ হতে পারে। অতিরিক্ত মাত্রায় ব্যবহারে শ্বাস-প্রশ্বাস মারাত্মকভাবে ধীর হয়ে যেতে পারে এবং মৃত্যু ঘটতে পারে।

ক্যানসারের সঙ্গেও সম্পর্ক আছে?

এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ গবেষণার একটি হলো International Agency for Research on Cancer বা IARC-এর মূল্যায়ন।

IARC-এর Monographs Working Group ২০২০ সালে ১০টি দেশের ১৬ জন বিজ্ঞানীর সমন্বয়ে আফিম সেবনের ক্যানসার ঝুঁকি নিয়ে বিদ্যমান বৈজ্ঞানিক গবেষণা পর্যালোচনা করে।

তারা epidemiological evidence, প্রাণী-গবেষণা এবং biological/mechanistic evidence বিশ্লেষণ করে আফিম সেবনকে Group 1 carcinogenic to humans হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করে। অর্থাৎ মানুষের জন্য আফিম সেবন ক্যানসার সৃষ্টি করতে পারে—এমন পর্যাপ্ত প্রমাণ পাওয়া গেছে।

IARC-এর মূল্যায়ন অনুযায়ী, আফিম সেবনের সঙ্গে বিভিন্ন ধরনের ক্যানসারের সম্পর্কের প্রমাণ পাওয়া গেছে। তবে আফিমের কোন নির্দিষ্ট রাসায়নিক উপাদান এককভাবে এই ক্যানসার ঝুঁকির জন্য দায়ী—তা পুরোপুরি নির্ধারিত নয়।

গবেষণাটি কোথায় প্রকাশিত হয়?

IARC-এর এই মূল্যায়ন IARC Monographs Volume 126: Opium Consumption-এ প্রকাশিত হয়।

এর সংক্ষিপ্ত বৈজ্ঞানিক মূল্যায়ন The Lancet Oncology-তেও প্রকাশিত হয়।

গবেষণাটি ছিল IARC Monographs Working Group-এর সমন্বিত বৈজ্ঞানিক মূল্যায়ন, যেখানে ১০টি দেশের ১৬ জন বিজ্ঞানী অংশ নেন।

এছাড়া আফিমের রাসায়নিক উপাদান, অ্যালকালয়েড এবং শরীরে এগুলোর কার্যক্রম নিয়ে বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক গবেষণাও হয়েছে। এসব গবেষণায় Papaver somniferum গাছের ল্যাটেক্সে মরফিন ও অন্যান্য অ্যালকালয়েড জমা হওয়ার বিষয়টি বিস্তারিতভাবে বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

অতিরিক্ত মাত্রায় কী হতে পারে?

আফিম বা অন্যান্য ওপিওয়েড অতিরিক্ত পরিমাণে শরীরে গেলে মস্তিষ্কের সেই অংশের কার্যক্রম দমন করতে পারে, যা শ্বাস-প্রশ্বাস নিয়ন্ত্রণ করে।

WHO-এর মতে, ওপিওয়েড ওভারডোজের গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে—

• চোখের মণি খুব ছোট হয়ে যাওয়া

• অচেতন হয়ে পড়া

• শ্বাস নিতে সমস্যা বা শ্বাস-প্রশ্বাস অত্যন্ত ধীর হয়ে যাওয়া

চিকিৎসা না পেলে এমন পরিস্থিতি প্রাণঘাতী হতে পারে।

জরুরি অবস্থায় naloxone নামের ওষুধ ওপিওয়েড ওভারডোজের প্রাণঘাতী প্রভাব প্রতিরোধ করতে পারে। তবে সন্দেহজনক ওভারডোজ হলে দ্রুত জরুরি চিকিৎসা সহায়তা নেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

তাহলে আফিমের ইতিহাস এত দীর্ঘ কেন?

আফিমের একটি বৈপরীত্য হলো—একদিকে এটি অত্যন্ত আসক্তিকর এবং ক্ষতিকর মাদক; অন্যদিকে এর কিছু অ্যালকালয়েড আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানে গুরুত্বপূর্ণ ওষুধ তৈরিতে ব্যবহৃত হয়েছে।

বিশেষ করে মরফিন ও কোডিন দীর্ঘদিন ধরে ব্যথা নিয়ন্ত্রণসহ চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়ে আসছে।

তাই মূল বিষয়টি হলো নিয়ন্ত্রিত চিকিৎসা ব্যবহার বনাম অনিয়ন্ত্রিত মাদক ব্যবহার—দুটিকে এক বিষয় হিসেবে দেখা উচিত নয়।

শেষ কথা

আফিম কোনো সাধারণ নেশাজাতীয় পদার্থ নয়। এর মধ্যে থাকা শক্তিশালী ওপিওয়েড অ্যালকালয়েড মস্তিষ্ক ও শ্বাস-প্রশ্বাসের ওপর গুরুতর প্রভাব ফেলতে পারে।

WHO ওপিওয়েড নির্ভরতা ও ওভারডোজকে গুরুত্বপূর্ণ জনস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে বিবেচনা করে। আর IARC-এর বৈজ্ঞানিক মূল্যায়নে আফিম সেবনকে মানুষের জন্য ক্যানসারজনিত ঝুঁকির সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে।

অর্থাৎ, আফিমের ইতিহাস যত পুরোনোই হোক—এর অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার শরীরের জন্য অত্যন্ত গুরুতর ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

আরও খবর পড়ুন