আপনার কানে থাকা 'তার যুক্ত হেডফোন' কিভাবে 'তার বিহীন' হলো জানেন?
একসময় গান শোনার জন্য মোবাইল ফোনের সঙ্গে হেডফোনের তার লাগানো ছিল স্বাভাবিক বিষয়। পকেটে ফোন রেখে গান শুনতে গেলে সেই তার জামাকাপড়ে আটকে যেত, জট পাকিয়ে যেত, কখনো আবার টান লেগে খুলেও যেত। কিন্তু আজ সেই জায়গা দখল করেছে ছোট ছোট তারবিহীন ইয়ারবাড। কানে লাগিয়ে গান শোনা যাচ্ছে, ফোনে কথা বলা যাচ্ছে, অথচ ফোনের সঙ্গে কোনো তারের সংযোগ নেই।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, যে হেডফোন একসময় তার ছাড়া কাজই করতে পারত না, সেটি কীভাবে তারবিহীন হয়ে উঠল?
তারযুক্ত হেডফোন থেকে শুরু
হেডফোনের ইতিহাস বেশ পুরোনো। উনিশ শতকের শেষ দিকে টেলিফোন অপারেটরদের যোগাযোগের কাজে ব্যবহৃত হতো ভারী হেডসেট। পরবর্তী সময়ে রেডিও শোনা, সংগীত উপভোগ এবং ব্যক্তিগতভাবে অডিও শোনার জন্য হেডফোনের ব্যবহার বাড়তে থাকে।
শুরুর দিকের হেডফোনে শব্দ পৌঁছানোর জন্য তারের মাধ্যমে বৈদ্যুতিক সংকেত পাঠানো হতো। মোবাইল ফোনের প্রচলন বাড়ার পর তারযুক্ত হেডফোন সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে ওঠে।
তবে তারের সীমাবদ্ধতাও ছিল। ফোনের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ প্রয়োজন হতো, চলাফেরার সময় তার বাধা সৃষ্টি করত এবং সংযোগস্থল নষ্ট হলে হেডফোনও অকেজো হয়ে যেতে পারত।
তার ছাড়াই শব্দ পৌঁছানোর উপায় কী?
তারবিহীন হেডফোনের মূল প্রযুক্তি হলো বেতার যোগাযোগ। এর মাধ্যমে একটি যন্ত্র থেকে অন্য যন্ত্রে তার ছাড়াই তথ্য পাঠানো যায়।
প্রথম দিকে রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি ব্যবহার করে তারবিহীন অডিও শোনার ব্যবস্থা তৈরি হয়েছিল। পরে ইনফ্রারেড এবং অন্যান্য বেতার প্রযুক্তিও ব্যবহৃত হয়। তবে এসব প্রযুক্তির নিজস্ব সীমাবদ্ধতা ছিল।
পরবর্তী সময়ে ব্লুটুথ প্রযুক্তি তারবিহীন অডিও ব্যবহারের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনে। ১৯৯০-এর দশকে ব্লুটুথ প্রযুক্তির বিকাশ শুরু হয় এবং ১৯৯৯ সালে এর প্রথম সংস্করণের আনুষ্ঠানিক স্পেসিফিকেশন প্রকাশিত হয়।
এর ফলে কাছাকাছি থাকা দুটি সামঞ্জস্যপূর্ণ যন্ত্রের মধ্যে স্বল্প দূরত্বে তার ছাড়াই তথ্য আদান-প্রদানের সুযোগ তৈরি হয়।
ব্লুটুথ কীভাবে হেডফোনে গান পৌঁছে দেয়?
প্রক্রিয়াটি আসলে বেশ সহজ।
আপনি যখন ফোনে গান চালু করেন, তখন ফোনের অডিও সিগন্যাল ডিজিটাল তথ্য হিসেবে ব্লুটুথের মাধ্যমে হেডফোনে পাঠানো হয়। হেডফোনের ভেতরের ইলেকট্রনিক সার্কিট সেই তথ্য গ্রহণ করে এবং অডিও সিগন্যাল তৈরি করে। এরপর হেডফোনের স্পিকার ড্রাইভার বৈদ্যুতিক সংকেতকে শব্দে রূপান্তর করে।
অর্থাৎ, শব্দ সরাসরি বাতাসের মধ্য দিয়ে ফোন থেকে আপনার কানে আসে না; বরং ফোন থেকে হেডফোনে তথ্য পৌঁছায়, তারপর হেডফোন নিজেই শব্দ তৈরি করে।
এ জন্যই তারবিহীন হেডফোনের ভেতরে ব্যাটারি, ব্লুটুথ চিপ এবং শব্দ তৈরির প্রয়োজনীয় ইলেকট্রনিক যন্ত্রাংশ থাকে।
ছোট ইয়ারবাড এত জনপ্রিয় হলো কেন?
তারবিহীন হেডফোন জনপ্রিয় হওয়ার পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। স্মার্টফোনে ব্লুটুথের বিস্তার, ছোট আকারের ব্যাটারি, উন্নত ইলেকট্রনিক সার্কিট এবং শক্তি সাশ্রয়ী প্রযুক্তি ইয়ারবাডকে আরও ছোট ও ব্যবহারবান্ধব করে তুলেছে।
২০১৬ সালে Apple AirPods বাজারে আসার পর ছোট, সম্পূর্ণ তারবিহীন ইয়ারবাড বিশ্বজুড়ে ব্যাপক পরিচিতি পায়। তবে তারবিহীন হেডফোনের ধারণা বা প্রযুক্তি তখনই প্রথম তৈরি হয়নি; এর আগেও বিভিন্ন ধরনের ওয়্যারলেস হেডফোন বাজারে ছিল।
বর্তমানের অনেক ইয়ারবাডে শুধু গান শোনাই নয়, মাইক্রোফোন দিয়ে কথা বলা, স্পর্শের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ, শব্দ কমানোর প্রযুক্তি এবং চার্জিং কেসের সুবিধাও রয়েছে।
তারবিহীন হলেও কি এর কোনো সীমাবদ্ধতা নেই?
তারবিহীন হেডফোন ব্যবহার করতে সুবিধা হলেও এর কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। ব্যাটারি চার্জ শেষ হয়ে গেলে ব্যবহার বন্ধ হয়ে যেতে পারে। কিছু মডেলে অডিও পৌঁছাতে সামান্য দেরি হতে পারে। আবার সস্তা বা নিম্নমানের ডিভাইসে শব্দের মান ও সংযোগের স্থিতিশীলতা নিয়েও সমস্যা দেখা দিতে পারে।
এ ছাড়া তারযুক্ত হেডফোনের মতো সরাসরি কেবল সংযোগ না থাকায় তারবিহীন মডেলগুলোকে নিয়মিত চার্জ দেওয়ার প্রয়োজন হয়।
শেষ কথা
তারযুক্ত হেডফোন থেকে তারবিহীন ইয়ারবাডে পরিবর্তন শুধু একটি তার বাদ দেওয়ার ঘটনা নয়। এর পেছনে রয়েছে বেতার যোগাযোগ, ব্লুটুথ, ক্ষুদ্র ইলেকট্রনিক যন্ত্রাংশ এবং ব্যাটারি প্রযুক্তির দীর্ঘ অগ্রগতি।
একসময় যে কাজের জন্য ফোনের সঙ্গে সরাসরি তার লাগাতে হতো, এখন সেই কাজই করা যাচ্ছে ছোট একটি যন্ত্র কানে লাগিয়ে। আর এই পরিবর্তন দেখিয়ে দিয়েছে, প্রযুক্তির উন্নতি অনেক সময় আমাদের পরিচিত কোনো যন্ত্রের ব্যবহারপদ্ধতিই বদলে দিতে পারে।