মুকেশ আম্বানি কি ভারতের ‘আসল বস’? ইলন মাস্কের প্রশ্নের পেছনে তথ্য কী বলছে ।
ভারতের ব্যবসা-বাণিজ্যের আলোচনায় একটি নাম ঘুরেফিরে আসে: মুকেশ আম্বানি। একজন ব্যবসায়ী দেশের নীতিনির্ধারণে কতটা প্রভাব রাখতে পারেন, প্রশ্নটি অনেক দিনের। অক্টোবরের শুরুতে বিশ্বের অন্যতম ধনী ব্যক্তি ইলন মাস্ক প্রশ্নটি আবার প্রকাশ্যে এনেছেন। তিনি এক্সে জানতে চেয়েছেন, আম্বানিই কি ভারতের আসল বস? প্রশ্ন তোলার পেছনে কারণ কী, আর কোন দাবির কতটা প্রমাণ আছে? কীভাবে শুরু হলো বিতর্ক ভারতে স্টারলিংকের উপগ্রহ ইন্টারনেট এখনো চালু হয়নি। কেন হয়নি, তা নিয়ে মাস্ক প্রথমে নাম না করে কিছু ‘ধনকুবের’-কে দায়ী করেন। তাঁর অভিযোগ, তাঁরা একচেটিয়া দখল ধরে রাখতে স্টারলিংককে ঠেকিয়ে রেখেছেন। এই দাবির পক্ষে তিনি কোনো প্রমাণ দেননি। পরদিন তিনি সরাসরি আম্বানির প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। পরে তিনি ব্যঙ্গ করে আম্বানিকে ‘প্রধানমন্ত্রী আম্বানি’ বলেও সম্বোধন করেন। অনুদানের প্রতিবেদন সামনে আনলেন মাস্ক নিজের অবস্থানের সমর্থনে মাস্ক দুটি পুরোনো প্রতিবেদন শেয়ার করেন। একটি আল জাজিরার ২০২২ সালের প্রতিবেদন, যেখানে রিলায়েন্সের অর্থায়নে চলা একটি প্রতিষ্ঠানের ফেসবুকে বিজেপির প্রচারণা জোরদার করার অভিযোগ ছিল। অন্যটি ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের ২০২৪ সালের প্রতিবেদন, যেখানে বলা হয়েছিল রিলায়েন্সসংশ্লিষ্ট কোম্পানি কুইক সাপ্লাই নির্বাচনী বন্ডের মাধ্যমে বিজেপিকে ৩৮৫ কোটি এবং শিবসেনাকে ২৫ কোটি টাকা দিয়েছে। এগুলো রাজনৈতিক অনুদান ও প্রচারণার তথ্য। স্টারলিংকের অনুমোদন আটকানোর সরাসরি প্রমাণ এতে নেই। সরকার ও রিলায়েন্স কী বলছে ভারতের যোগাযোগ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, স্যাটেলাইট যোগাযোগের নিয়ম ন্যায্য ও বৈষম্যহীন। তাদের ভাষ্য, স্টারলিংকসহ তিন লাইসেন্সধারী প্রায় একই নিয়ন্ত্রক ধাপে আছে এবং স্পেকট্রামের আগে প্রত্যেককে নিরাপত্তা মূল্যায়ন শেষ করতে হবে। যোগাযোগমন্ত্রী জ্যোতিরাদিত্য সিন্ধিয়া বলেছেন, ভারতে কোনো খাতে একচেটিয়া ব্যবসা অনুমোদিত নয়। রিলায়েন্সও অভিযোগ অস্বীকার করেছে। তাদের বক্তব্য, তারা প্রতিযোগিতাকে ভয় পায় না এবং স্টারলিংককে স্বাগত জানায়। জিওর নিজস্ব স্যাটেলাইট সেবাও একই ছাড়পত্রের অপেক্ষায়। যে তথ্যটি আলোচনায় কম এসেছে স্পেকট্রাম বরাদ্দ নিয়ে জিও আর স্টারলিংকের অবস্থান ছিল আলাদা। জিও চেয়েছিল নিলাম, স্টারলিংক চেয়েছিল প্রশাসনিক বরাদ্দ। শেষ পর্যন্ত ভারত স্টারলিংকের পছন্দের পথই বেছে নিয়েছে। তা ছাড়া জিও ও এয়ারটেল দুই কোম্পানিই স্টারলিংকের সরঞ্জাম বিক্রির চুক্তি করেছে। তবে সেবা চালুর জন্য এখনো নিরাপত্তা ছাড়পত্র এবং স্পেকট্রামের দাম চূড়ান্ত হওয়া বাকি। প্রশ্নটি কেন উঠছে কারণ রিলায়েন্সের আকার। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটির একীভূত আয় ছিল ১১,৭৫,৯১৯ কোটি টাকা এবং নিট মুনাফা ৯৫,৬১০ কোটি টাকা। জিওর গ্রাহকসংখ্যা ৫২ কোটির বেশি। ব্লুমবার্গ বিলিয়নেয়ার্স ইনডেক্স অনুযায়ী জুলাই ২০২৬-এ আম্বানির সম্পদ ছিল ৮৪.২ বিলিয়ন ডলার। আকার বড় হওয়া মানেই নিয়ন্ত্রণ নয়, কিন্তু এত বড় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সরকারি সিদ্ধান্তের সম্পর্ক নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। সমালোচনা পুরোনো, ব্যাখ্যা একাধিক রিলায়েন্সের সঙ্গে সরকারের ঘনিষ্ঠতা নিয়ে সমালোচনা নতুন নয়। ‘গ্যাস ওয়ার্স’ বইয়ে দাবি করা হয়েছিল, কৃষ্ণা-গোদাবরী গ্যাস চুক্তি রিলায়েন্সের অনুকূলে তৈরি হয়েছিল। রিলায়েন্স তখন লেখক ও প্রকাশকদের আইনি নোটিশ পাঠায়। দ্য ওয়্যারের এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, মোদির রাজনৈতিক প্রকল্প আর আম্বানির কর্পোরেট সাম্রাজ্য পাশাপাশি এগিয়েছে। ভিন্ন ব্যাখ্যাও আছে। ব্লুমবার্গের একটি মতামত লেখায় বলা হয়েছে, জিওর সাফল্যের মূলে সরকারের উন্নয়ন-অগ্রাধিকারের সঙ্গে ব্যবসার মিল। সস্তা ও সর্বত্র ইন্টারনেট ব্যবসার প্রস্তাবও ছিল, সরকারের লক্ষ্যও ছিল। এগুলো বিশ্লেষণ ও মতামত, কোনো আদালতের রায় নয়। তাহলে উত্তর কী আম্বানি ভারতের অর্থনীতিতে অত্যন্ত প্রভাবশালী, এটি তথ্যই বলছে। কিন্তু তিনি সরকারি সিদ্ধান্ত নিয়ন্ত্রণ করেন, বা তাঁর কারণেই স্টারলিংক আটকে আছে, এমন দাবির প্রমাণ এখনো সামনে আসেনি। সরকার ও রিলায়েন্স দুজনই তা অস্বীকার করছে। এখন নজর স্পেকট্রামের দাম ও নিরাপত্তা ছাড়পত্রের দিকে। এই দুই সিদ্ধান্ত কীভাবে হয়, তার ওপর নির্ভর করবে প্রতিযোগিতা সত্যিই উন্মুক্ত থাকছে কি না।


