এআইয়ের চাপে গুগলের ব্যবসায় ধাক্কা, একদিনেই কমল প্রায় ৫০১ বিলিয়ন ডলার ।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের কারণে ইন্টারনেটে তথ্য খোঁজার ধরন দ্রুত বদলে যাচ্ছে। আগে কোনো তথ্য জানতে গুগলে সার্চ করে বিভিন্ন ওয়েবসাইটে প্রবেশ করতেন ব্যবহারকারীরা। এখন এআই সরাসরি প্রশ্নের উত্তর দেওয়ায় সেই অভ্যাসে পরিবর্তন আসছে। আর এই পরিবর্তনের প্রভাব পড়তে শুরু করেছে গুগলের মূল বিজ্ঞাপন ব্যবসায়। তৃতীয় প্রান্তিকের আর্থিক ফল প্রকাশের পর গুগলের মূল প্রতিষ্ঠান অ্যালফাবেটের শেয়ারের দাম একদিনে ১৩ শতাংশের বেশি কমে যায়। এতে প্রতিষ্ঠানটির বাজারমূল্য থেকে প্রায় ৫০১ বিলিয়ন ডলার কমে যায় বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ২০২৬ সালের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তৃতীয় প্রান্তিকে অ্যালফাবেটের মোট আয় হয়েছে ১২৭.৬ বিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ২৫ শতাংশ বেশি। তবে বিশ্লেষকদের পূর্বাভাস পূরণ করতে পারেনি প্রতিষ্ঠানটি। অংশীদারদের পাওনা বাদ দিয়ে আয় দাঁড়ায় ১১১.২ বিলিয়ন ডলার। একই সময়ে প্রতিষ্ঠানটির নিট মুনাফা আগের বছরের তুলনায় ২৫ শতাংশ কমে ২৬.২ বিলিয়ন ডলারে নেমে আসে। অ্যালফাবেটের আয়ের বড় অংশ আসে গুগল সার্চ ও বিজ্ঞাপন ব্যবসা থেকে। তৃতীয় প্রান্তিকে সার্চ ও অন্যান্য বিজ্ঞাপন খাতের আয় বেড়ে ৬৩.৩ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছালেও প্রবৃদ্ধির হার ছিল ১২ শতাংশ। গত পাঁচ প্রান্তিকের মধ্যে এই খাতের প্রবৃদ্ধি ছিল সবচেয়ে ধীর। বিশ্লেষকদের প্রত্যাশার তুলনায় বিজ্ঞাপন আয় কম হওয়ায় বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ আরও বেড়েছে। এআই সার্চ বাড়লেও বিজ্ঞাপন থেকে আয় নিয়ে প্রশ্ন গুগলের সার্চ ব্যবস্থায় যুক্ত হয়েছে এআই মোড, যেখানে ব্যবহারকারীরা প্রচলিত সার্চ ফলাফলের পরিবর্তে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে সরাসরি উত্তর পেতে পারেন। প্রতিষ্ঠানটির চিফ বিজনেস অফিসার ফিলিপ শিন্ডলার বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে আলোচনায় জানান, এআই মোডের ব্যবহার বাড়ছে। তবে প্রচলিত সার্চের তুলনায় এআইয়ের মাধ্যমে করা প্রশ্ন থেকে বর্তমানে বিজ্ঞাপন আয়ের সুযোগ কম। এখানেই গুগলের ব্যবসার সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। প্রচলিত সার্চে ব্যবহারকারীরা বিভিন্ন ওয়েবসাইটের লিংকে প্রবেশ করেন, যেখানে বিজ্ঞাপন দেখানোর সুযোগ থাকে। কিন্তু এআই যদি সরাসরি উত্তর দিয়ে দেয়, তাহলে ব্যবহারকারীর ওয়েবসাইটে প্রবেশের প্রয়োজন কমতে পারে। এতে সার্চের ব্যবহার বাড়লেও বিজ্ঞাপন থেকে আয় একই হারে বাড়বে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। গুগল অবশ্য এআই মোডেও বিজ্ঞাপন যুক্ত করার পরিকল্পনা নিয়ে আশাবাদী। এআই অবকাঠামোয় বিপুল বিনিয়োগের চাপ এআই প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকতে গুগল ডেটা সেন্টার, সার্ভার, চিপ এবং কম্পিউটিং সক্ষমতা বাড়াতে বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করছে। শুধু ২০২৬ সালের তৃতীয় প্রান্তিকেই প্রতিষ্ঠানটির মূলধনী ব্যয় হয়েছে প্রায় ৫১.৪ বিলিয়ন ডলার। এই ব্যয়ের চাপ নগদ অর্থপ্রবাহেও প্রভাব ফেলেছে। ত্রৈমাসিক হিসাবে অ্যালফাবেটের ফ্রি ক্যাশ ফ্লো প্রায় ৯.১ বিলিয়ন ডলার ঋণাত্মক হয়েছে। এদিকে ভবিষ্যতে ডেটা সেন্টার, কম্পিউটিং অবকাঠামো ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সম্পদের জন্য অ্যালফাবেটের সম্ভাব্য চুক্তিভিত্তিক দায় এক ট্রিলিয়ন ডলারেরও বেশি। ফলে এআই খাতে এত বড় বিনিয়োগের বিপরীতে প্রতিষ্ঠানটি কত দ্রুত আয় বাড়াতে পারবে, তা এখন বিনিয়োগকারীদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে উঠেছে। ইনভেস্টিং ডটকমের জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক টমাস মনটেইরোর মূল্যায়ন অনুযায়ী, এআই প্রযুক্তি থেকে প্রচলিত সার্চ বিজ্ঞাপনের মতো আয় তৈরি করতে না পারলে অবকাঠামো খাতে গুগলের বিপুল ব্যয় ভবিষ্যতে আর্থিক চাপ বাড়াতে পারে। ক্লাউড ব্যবসায় বড় প্রবৃদ্ধি সার্চ ও বিজ্ঞাপন ব্যবসায় চাপ থাকলেও গুগল ক্লাউড বিভাগে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। তৃতীয় প্রান্তিকে এই বিভাগের আয় ১০৩ শতাংশ বেড়ে ৩০.৭ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। একই সময়ে পরিচালন মুনাফা হয়েছে ১১.১ বিলিয়ন ডলার। এআই অবকাঠামো ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের জন্য এআই সেবা দেওয়ার চাহিদা বৃদ্ধির কারণে এই প্রবৃদ্ধি এসেছে। তবে গুগল ক্লাউডের বড় গ্রাহকদের মধ্যে অ্যানথ্রোপিকের মতো এআই প্রতিষ্ঠানও রয়েছে, যারা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বাজারে গুগলের প্রতিদ্বন্দ্বী। অর্থাৎ, গুগলের ক্লাউড ব্যবসা থেকে আয় বাড়লেও সেই প্রযুক্তি ব্যবহার করেই অন্য প্রতিষ্ঠানগুলো এআই বাজারে প্রতিযোগিতা করছে। অ্যালফাবেটের সাম্প্রতিক শেয়ারদর পতন শুধু একটি প্রান্তিকের আর্থিক ফলাফলের প্রতিক্রিয়া নয়; এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে এআই প্রযুক্তির কারণে ভবিষ্যতে সার্চ ও বিজ্ঞাপন ব্যবসার পরিবর্তনের আশঙ্কা। গুগলকে এখন একদিকে এআই খাতে বড় বিনিয়োগ চালিয়ে যেতে হচ্ছে, অন্যদিকে দীর্ঘদিনের বিজ্ঞাপননির্ভর আয়ের কাঠামোও ধরে রাখতে হচ্ছে। এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করাই প্রতিষ্ঠানটির সামনে বড় চ্যালেঞ্জ।


