AR News
নিউজ · ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

ভারতে গো রক্ষক আন্দোলন: রক্ষা নাকি সহিংসতার নামান্তর?

ভারতে গো রক্ষক আন্দোলন: রক্ষা নাকি সহিংসতার নামান্তর?

ভারতে "গো রক্ষক" বা "গৌ রক্ষক" নামটি এখন আর শুধু ধর্মীয় বিশ্বাসের প্রতীক নয়, বরং জাতীয় রাজনীতি ও সাম্প্রদায়িক উত্তেজনার একটি স্পর্শকাতর অধ্যায় হয়ে উঠেছে। হিন্দুধর্মে গরুকে পবিত্র প্রাণী হিসেবে গণ্য করা হয়, আর এই বিশ্বাসকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছে স্ব-ঘোষিত এই "রক্ষাকারী" গোষ্ঠীগুলো।

গো রক্ষক আসলে কারা?

গো রক্ষক গোষ্ঠীগুলো মূলত স্থানীয় পর্যায়ে গড়ে ওঠা ছোট ছোট সংগঠন, যাদের অনেকেই হিন্দু জাতীয়তাবাদী মতাদর্শের সঙ্গে যুক্ত। এদের মধ্যে হরিয়ানার "Save the Cow" গোষ্ঠীটি অন্যতম পরিচিত। এই গোষ্ঠীর সদস্যরা প্রায়ই সশস্ত্র অবস্থায় হাইওয়ে ও গ্রামীণ সড়কে টহল দেয়, গরু পাচারকারী সন্দেহে যানবাহন থামিয়ে তল্লাশি চালায়।

তদন্তে জানা গেছে, কিছু গোষ্ঠী গরুবাহী যানবাহন নিরাপদে যেতে দেওয়ার বিনিময়ে অর্থ আদায় করে, আবার যারা তা দিতে ব্যর্থ হয় বা প্রকৃতপক্ষে দোষী না হলেও সন্দেহভাজন হয়, তারা হয়রানি, মারধর এমনকি প্রাণঘাতী হামলার শিকার হয়েছে। রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, জব্দ করা গরু প্রায়ই মুসলিম ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে নিয়ে হিন্দুদের কাছে বিক্রির জন্য হস্তান্তর করা হয়।

পরিসংখ্যানে পরিস্থিতি

তথ্যভিত্তিক সাংবাদিকতা প্রতিষ্ঠান IndiaSpend-এর দীর্ঘমেয়াদী পর্যালোচনায় উঠে এসেছে কিছু উদ্বেগজনক চিত্র:

২০১০ থেকে ২০১৭ সালের মাঝামাঝি সময়ে ভারতে অন্তত ৬৩টি গো-রক্ষক সংক্রান্ত হামলার ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে।

এসব হামলায় ২৮ জন নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে ২৪ জনই মুসলিম, এবং আহত হয়েছেন ১২৪ জন।

রিপোর্ট হওয়া ঘটনাগুলোর প্রায় ৯৭ শতাংশ ঘটেছে ২০১৪ সালে বিজেপি কেন্দ্রীয় সরকারে আসার পর থেকে।

এর মধ্যে ৫৩ শতাংশ ঘটনা ঘটেছে বিজেপি-শাসিত রাজ্যগুলোতে।

মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচের একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৫ সালের মে থেকে ২০১৮ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত এই ধরনের হামলায় অন্তত ৪৪ জন নিহত হন, যাদের মধ্যে ৩৬ জনই ছিলেন মুসলিম। সংস্থাটির দাবি, অনেক ক্ষেত্রে পুলিশ হামলাকারীদের বিরুদ্ধে মামলা এগিয়ে নিতে গড়িমসি করেছে।

রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া ও বিতর্ক

২০১৭ সালে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট কেন্দ্রীয় সরকার এবং একাধিক রাজ্যের কাছে ব্যাখ্যা তলব করে, কেন গো-রক্ষা সংগঠনগুলোকে নিষিদ্ধ করা হবে না। কংগ্রেস নেতাদের দায়ের করা এক আবেদনের ভিত্তিতে উত্তরপ্রদেশ, মহারাষ্ট্র, গুজরাট, ঝাড়খণ্ড, রাজস্থান ও কর্ণাটক সরকারকে নোটিশ পাঠানো হয়।

অন্যদিকে, খোদ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি জনসমক্ষে মন্তব্য করেছিলেন যে, এই ধরনের গোষ্ঠীর বেশিরভাগ সদস্যই আসলে গো-রক্ষার ছদ্মবেশে সমাজবিরোধী কার্যকলাপে লিপ্ত। তিনি রাজ্য সরকারগুলোকে এসব গোষ্ঠীর তথ্য সংগ্রহের নির্দেশও দেন।

তবে বাস্তবতা কিছুটা ভিন্ন পথে হেঁটেছে। হরিয়ানা সরকার এক পর্যায়ে "Save the Cow" গোষ্ঠীর সদস্যদের লাইসেন্স দিয়ে পুলিশকে সহায়তার কাজে যুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেয় — যদিও শর্ত দেওয়া হয় যে তারা আইন নিজের হাতে তুলে নিতে পারবে না, শুধু পুলিশকে তথ্য দিতে পারবে।

সমর্থন ও সমালোচনার দুই মুখ

সমর্থকদের যুক্তি: ভারতের অধিকাংশ রাজ্যে গরু জবাই আইনত নিষিদ্ধ। এই গোষ্ঠীগুলো দাবি করে, তারা এই আইন বাস্তবায়নে সহায়তা করছে এবং অবৈধ গরু পাচার রোধ করছে।

সমালোচকদের যুক্তি: মানবাধিকার সংগঠন ও বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর অভিযোগ, "গো রক্ষা"র নামে এই গোষ্ঠীগুলো মূলত মুসলিম ও দলিত সম্প্রদায়ের ওপর সহিংসতা চালানোর সুযোগ পেয়েছে। গবেষক রাধা সরকারের মতে, গো-রক্ষা আন্দোলন নতুন কিছু নয়, তবে বিজেপির ক্ষমতায় আসার পর এই গোষ্ঠীগুলো অভূতপূর্ব মাত্রায় সংগঠিত মব হামলা চালানোর সাহস পেয়েছে।

উপসংহার

গো রক্ষক ইস্যুটি ভারতীয় সমাজে ধর্মীয় বিশ্বাস, আইন প্রয়োগ ও সাম্প্রদায়িক রাজনীতির এক জটিল সংমিশ্রণ। একদিকে এটি অনেকের কাছে ঐতিহ্যগত বিশ্বাস রক্ষার প্রচেষ্টা, অন্যদিকে মানবাধিকার সংস্থাগুলোর নথিভুক্ত তথ্য অনুযায়ী এটি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে সহিংসতার একটি হাতিয়ারেও পরিণত হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে ভারতের সর্বোচ্চ আদালত থেকে শুরু করে কেন্দ্রীয় সরকার পর্যন্ত বিতর্ক অব্যাহত রয়েছে

আরও খবর পড়ুন