ডিআইজির বাড়িতে ডিবির অভিযান, মাদক পরীক্ষা ছাড়াই ৮৫ জনের সাজা!
রাজধানীর ভাটারায় পুলিশের অতিরিক্ত ডিআইজি আবদুল্লাহ আল জহিরের বাড়িতে অভিযান চালিয়ে ৮৫ জনকে আটক ও কারাদণ্ড দেওয়ার ঘটনায় প্রশ্ন উঠেছে বিচারপ্রক্রিয়া ও পুলিশের অভিযানের ধরন নিয়ে। প্রায় তিন ঘণ্টার অভিযানে মাত্র একটি ইয়াবা বড়ি, অল্প পরিমাণ কুশ, ইয়াবা সেবনের সরঞ্জাম ও চারটি মদের বোতল উদ্ধারের তথ্য পাওয়া গেছে। আটক ব্যক্তিদের মাদক গ্রহণের পরীক্ষা করা হয়েছিল কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। প্রথম আলো, দ্য ডেইলি স্টার, ঢাকা ট্রিবিউন ও দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৯ অক্টোবর দিবাগত রাতে ভাটারার পুলিশ অফিসার্স হাউজিং সোসাইটি-১ এলাকার তিনতলা বাড়িটিতে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) উত্তরা বিভাগের একটি দল অভিযান চালায়। আটক ৮৫ জনের মধ্যে ২৬ জন নারী ছিলেন। পরে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে তাঁদের বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড ও জরিমানা করা হয়। পুরুষদের এক মাসের কারাদণ্ড ও এক হাজার টাকা জরিমানা এবং নারীদের ১৫ দিনের কারাদণ্ড ও ৫০০ টাকা জরিমানা করা হয়। জরিমানা দিতে ব্যর্থ হলে অতিরিক্ত কারাদণ্ডের বিধানও ছিল বলে সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রথম আলোর প্রতিবেদনে এক আটক ব্যক্তির বাবার অভিযোগ, তাঁর ছেলে অনুষ্ঠানে বাদ্যযন্ত্র বাজানোর কাজ করতে গিয়েছিলেন। তাঁকে মাদক গ্রহণের অভিযোগে সাজা দেওয়া হলেও পরীক্ষা করা হয়নি। তবে এই বক্তব্য থেকে সব আটক ব্যক্তির ক্ষেত্রে একই ঘটনা ঘটেছে বলে নিশ্চিত হওয়া যায় না। ঢাকা ট্রিবিউনের প্রতিবেদনেও বলা হয়েছে, জব্দতালিকায় সীমিত পরিমাণ মাদক উদ্ধারের তথ্য থাকলেও প্রত্যেক ব্যক্তির বিরুদ্ধে কী প্রমাণের ভিত্তিতে সাজা দেওয়া হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। ডিবির কর্মকর্তাদের দাবি, পুলিশ পৌঁছানোর আগেই উপস্থিত ব্যক্তিরা মদ ও ইয়াবা সেবন করেছিলেন। সে কারণে ঘটনাস্থলে অল্প পরিমাণ মাদক পাওয়া যায়। তবে প্রত্যেকের বিরুদ্ধে পৃথকভাবে কী প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়েছিল, তা প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলোতে স্পষ্ট নয়। পুলিশের দাবি, বাড়িটিতে নিয়মিত পার্টির আয়োজন করা হতো। ডিবির উত্তরা বিভাগের উপকমিশনার ইলিয়াস কবিরের বক্তব্য অনুযায়ী, বাড়িটির পাঁচটি কক্ষ অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে ভাড়া দেওয়া হতো এবং ২০২৫ সাল থেকে সেখানে মাসে ২০ থেকে ২২টি পার্টির আয়োজন করা হচ্ছিল। বাড়িটির ব্যবস্থাপনা ও অর্থ ভাগাভাগি নিয়েও পুলিশ অভিযোগ তুলেছে। অন্যদিকে, বাড়ির মালিক আবদুল্লাহ আল জহির বলেছেন, বাড়িটি ব্যক্তিগত অনুষ্ঠান আয়োজনের জন্য ভাড়া দেওয়া হতো এবং সেখানে অবৈধ কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ ছিল। ভাড়াটিয়ারা গোপনে অপরাধ করলে তার দায় স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাড়ির মালিকের ওপর বর্তায় না বলেও তিনি যুক্তি দিয়েছেন। অভিযানের পর আবদুল্লাহ আল জহিরকে পুলিশ সদর দপ্তরে অন্য দায়িত্বে সংযুক্ত করা হয়। তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ এবং বাড়িটির ব্যবস্থাপনা নিয়ে তদন্তের ফলই তাঁর ভূমিকা সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ধারণা দিতে পারে। ঘটনাটি ঘিরে এখন প্রধান প্রশ্ন হলো, আটক ৮৫ জনের প্রত্যেকের বিরুদ্ধে কী প্রমাণ ছিল এবং মাদক গ্রহণের পরীক্ষা না হয়ে থাকলে সাজা দেওয়ার ভিত্তি কী ছিল। একই সঙ্গে অভিযানের সময় সিসিটিভি ক্যামেরা খোলা, পুলিশের ধারণ করা ভিডিও ছড়িয়ে পড়া এবং জব্দতালিকায় পার্টির সরঞ্জাম না থাকার বিষয়গুলো নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে প্রথম আলো। মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালনার পাশাপাশি প্রত্যেক অভিযুক্তের বিরুদ্ধে প্রমাণের ভিত্তিতে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। তাই এই ঘটনার পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়নের জন্য ভ্রাম্যমাণ আদালতের আদেশ, জব্দতালিকা এবং সংশ্লিষ্ট তদন্তের তথ্য প্রকাশ গুরুত্বপূর্ণ।


