Full Story
ঘুমের সময় মস্তিষ্কে কী হয়?

ঘুমের সময় মস্তিষ্কে কী হয়?

প্রতিদিন রাতে আমরা যখন ঘুমিয়ে পড়ি, তখন বাইরের জগতের সঙ্গে যোগাযোগ অনেকটাই বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। চোখ বন্ধ থাকে, শরীর বিশ্রামে যায়, চারপাশের শব্দেও আগের মতো সাড়া পাওয়া যায় না। কিন্তু এই সময় মস্তিষ্ক কি সত্যিই বিশ্রাম নেয়? বাস্তবে ঘুমের সময়ও মস্তিষ্ক সক্রিয় থাকে। বরং দিনের বেলায় সংগ্রহ করা তথ্য সাজানো, স্মৃতি সংরক্ষণ, আবেগ নিয়ন্ত্রণ এবং শরীরের স্বাভাবিক কার্যক্রম বজায় রাখার মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজ চলতে থাকে। ঘুমের সময় মস্তিষ্ক একটি নির্দিষ্ট ছন্দে বিভিন্ন পর্যায়ের মধ্য দিয়ে যায়। এই পর্যায়গুলো প্রধানত দুই ধরনের—নন-র‌্যাপিড আই মুভমেন্ট বা Non-REM এবং র‌্যাপিড আই মুভমেন্ট বা REM। একটি পূর্ণ ঘুমচক্র সাধারণত ৮০ থেকে ১০০ মিনিট স্থায়ী হয়। রাতে একজন মানুষ কয়েকবার এই চক্রের মধ্য দিয়ে যান। তবে রাতের শুরুতে গভীর ঘুমের সময় বেশি থাকে, আর ভোরের দিকে REM ঘুমের সময় বাড়তে থাকে। ঘুমানোর পর প্রথমে শুরু হয় Non-REM পর্যায়। এর প্রথম ধাপে মানুষ জেগে থাকা অবস্থা থেকে ধীরে ধীরে ঘুমের দিকে এগিয়ে যায়। এ সময় হৃদস্পন্দন ও শ্বাস-প্রশ্বাস ধীর হতে শুরু করে, পেশি শিথিল হয় এবং মস্তিষ্কের বৈদ্যুতিক কার্যকলাপের ধরন পরিবর্তিত হয়। এরপর দ্বিতীয় ধাপে ঘুম আরও গভীর হয়। শরীরের তাপমাত্রা কমে আসে এবং মস্তিষ্কে বিশেষ ধরনের বৈদ্যুতিক সংকেত দেখা যায়, যা ঘুমের স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে ভূমিকা রাখে। এরপর আসে গভীর ঘুম বা তৃতীয় ধাপ। এই পর্যায়ে মস্তিষ্কের বৈদ্যুতিক তরঙ্গ অনেক ধীর হয়ে যায়। শরীরের হৃদস্পন্দন ও শ্বাস-প্রশ্বাস ঘুমের সবচেয়ে ধীর পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে। এ সময় শারীরিক পুনরুদ্ধার, টিস্যু মেরামত এবং হরমোন নিঃসরণের মতো প্রক্রিয়া গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। গভীর ঘুম থেকে কাউকে জাগানো তুলনামূলক কঠিন। পর্যাপ্ত গভীর ঘুম না হলে সকালে ঘুম থেকে ওঠার পরও ক্লান্তি অনুভূত হতে পারে। স্মৃতি সংরক্ষণে ঘুমের ভূমিকা দিনভর আমরা অসংখ্য তথ্য, অভিজ্ঞতা ও ঘটনা মনে রাখি। কিন্তু সব তথ্য মস্তিষ্ক একই গুরুত্ব দিয়ে সংরক্ষণ করে না। ঘুমের সময় মস্তিষ্ক নতুন শেখা বিষয়গুলো প্রক্রিয়াজাত করে এবং গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দীর্ঘমেয়াদি স্মৃতিতে সংরক্ষণে সহায়তা করে। গবেষণায় দেখা গেছে, Non-REM ও REM—উভয় পর্যায়ই স্মৃতি সুসংহত করার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখে। বিশেষ করে গভীর ঘুমের সময় দিনের শেখা তথ্যের সঙ্গে আগে থেকে সংরক্ষিত স্মৃতির সম্পর্ক তৈরি হতে পারে। অন্যদিকে REM ঘুম আবেগপূর্ণ স্মৃতি ও শেখার কিছু প্রক্রিয়ায় ভূমিকা রাখে। এ কারণেই পর্যাপ্ত ঘুম না হলে মনোযোগ, শেখার ক্ষমতা এবং নতুন তথ্য মনে রাখার ক্ষেত্রে সমস্যা দেখা দিতে পারে। স্বপ্ন কেন দেখা যায়? ঘুমের সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিষয়গুলোর একটি হলো স্বপ্ন। সাধারণত REM পর্যায়ে স্বপ্ন বেশি জীবন্ত ও স্পষ্ট হয়। এ সময় মস্তিষ্কের কার্যকলাপ অনেকটা জেগে থাকার সময়ের মতো সক্রিয় থাকে। চোখের পাতা বন্ধ থাকলেও চোখ দ্রুত এদিক-সেদিক নড়াচড়া করে। একই সঙ্গে হাত-পায়ের অধিকাংশ পেশি সাময়িকভাবে নিষ্ক্রিয় থাকে, যাতে মানুষ স্বপ্নের দৃশ্য অনুযায়ী বাস্তবে নড়াচড়া করে নিজেকে আঘাত না করেন। তবে শুধু REM পর্যায়েই স্বপ্ন দেখা হয় না; Non-REM ঘুমেও স্বপ্নের মতো অভিজ্ঞতা হতে পারে। বিজ্ঞানীরা এখনো নিশ্চিতভাবে জানেন না মানুষ কেন স্বপ্ন দেখে। স্মৃতি, আবেগ এবং মস্তিষ্কের বিভিন্ন সংকেতের সমন্বয় স্বপ্ন তৈরিতে ভূমিকা রাখতে পারে বলে গবেষণায় ধারণা পাওয়া যায়। ঘুমের সময় মস্তিষ্ক কীভাবে বর্জ্য পরিষ্কার করে? মস্তিষ্কের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো বিপাকীয় কার্যক্রমের ফলে তৈরি হওয়া বর্জ্য পদার্থ অপসারণ। গবেষণায় দেখা গেছে, ঘুমের সময় মস্তিষ্কের কোষগুলোর মধ্যবর্তী স্থানে তরল চলাচল ও বর্জ্য অপসারণের প্রক্রিয়া পরিবর্তিত হয়। এ ব্যবস্থাকে গ্লিম্ফ্যাটিক সিস্টেম (Glymphatic System) বলা হয়। এটি মস্তিষ্কের কিছু বর্জ্য পদার্থ অপসারণে ভূমিকা রাখে। এই প্রক্রিয়া নিয়ে বিজ্ঞানীদের আগ্রহের একটি কারণ হলো, মস্তিষ্কে অ্যামাইলয়েড-বিটা ও টাউয়ের মতো প্রোটিন জমার সঙ্গে আলঝেইমার রোগের সম্পর্ক রয়েছে। ঘুম ও মস্তিষ্কের বর্জ্য অপসারণের মধ্যে সম্পর্ক নিয়ে গবেষণা চলছে। তবে ঘুমের মাধ্যমে এসব প্রোটিন পুরোপুরি দূর হয়ে যায় কিংবা পর্যাপ্ত ঘুম আলঝেইমার প্রতিরোধ নিশ্চিত করে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো প্রমাণ এখনো নেই। ঘুম কম হলে মস্তিষ্কে কী প্রভাব পড়ে? পর্যাপ্ত ঘুম না হলে মস্তিষ্কের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হতে পারে। মনোযোগ ধরে রাখা, সিদ্ধান্ত নেওয়া, সমস্যা সমাধান এবং আবেগ নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে পড়ে। দীর্ঘদিন ঘুমের ঘাটতি থাকলে শেখার ক্ষমতা ও স্মৃতির ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। পাশাপাশি শরীরের রোগ প্রতিরোধব্যবস্থা, বিপাকীয় কার্যক্রম এবং মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা থাকে। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল হার্ট, লাং অ্যান্ড ব্লাড ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, প্রাপ্তবয়স্কদের সাধারণত প্রতি রাতে ৭ থেকে ৯ ঘণ্টা ঘুম প্রয়োজন। তবে বয়স, শারীরিক অবস্থা ও ব্যক্তিভেদে ঘুমের চাহিদা আলাদা হতে পারে। সব মিলিয়ে ঘুম কেবল শরীরকে বিশ্রাম দেওয়ার সময় নয়; এটি মস্তিষ্কের জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি জৈবিক প্রক্রিয়া। এই সময় মস্তিষ্ক স্মৃতি সাজায়, শেখা তথ্য সংরক্ষণে সহায়তা করে, আবেগ প্রক্রিয়াজাত করে এবং বর্জ্য অপসারণের মতো কাজ চালিয়ে যায়। অর্থাৎ আমরা যখন ঘুমিয়ে থাকি, তখনও মস্তিষ্ক নিজের মতো করে ব্যস্ত থাকে।

Posted by: Abdul Rohim