অনলাইন জুয়ার বিস্তার কেন বন্ধ হচ্ছে না? সাইট বন্ধ হলেও যেভাবে ফিরে আসছে নতুন প্ল্যাটফর্ম
শুরুটা হয়েছিল মাত্র ১০০ টাকা দিয়ে। অনলাইনে একটি বাজি ধরে কিছু টাকা জেতার পর মনে হয়েছিল, অল্প বিনিয়োগেই হয়তো ভালো আয় করা সম্ভব। কিন্তু ধীরে ধীরে বাজির পরিমাণ বাড়তে থাকে। একসময় নিজের জমানো টাকা শেষ হয়ে যায়, ধার করতে হয় পরিচিতজনদের কাছ থেকেও। শেষ পর্যন্ত যে খেলায় লাভের আশায় পা রেখেছিলেন, সেটিই হয়ে ওঠে আর্থিক ক্ষতির কারণ। বাংলাদেশে অনলাইন জুয়ার সঙ্গে জড়িয়ে পড়া অনেক মানুষের অভিজ্ঞতা এমনই। মোবাইল ফোনে কয়েকটি ক্লিক, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আকর্ষণীয় বিজ্ঞাপন আর মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে টাকা পাঠানোর সুযোগ—সব মিলিয়ে জুয়ার প্ল্যাটফর্মগুলো সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে সহজেই। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অভিযান চালাচ্ছে, ওয়েবসাইট বন্ধ হচ্ছে; কিন্তু কিছুদিন পর নতুন ঠিকানা বা অন্য নামে আবার হাজির হচ্ছে এসব প্ল্যাটফর্ম। প্রশ্ন হচ্ছে, এত অভিযান ও নিষেধাজ্ঞার পরও অনলাইন জুয়ার বিস্তার থামছে না কেন? ছোট অঙ্কের বাজি, বড় ক্ষতির ফাঁদ অনলাইন জুয়ার প্ল্যাটফর্মগুলো সাধারণত ব্যবহারকারীকে শুরুতেই বড় অঙ্কের অর্থ বিনিয়োগ করতে বলে না। বরং অল্প টাকা দিয়ে খেলার সুযোগ, নতুন অ্যাকাউন্টে বোনাস কিংবা প্রথম দিকে কিছু জেতার অভিজ্ঞতা দিয়ে ব্যবহারকারীকে আকৃষ্ট করা হয়। দ্য ডেইলি স্টারের ১৯ জুলাই ২০২৬-এর অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে দেখা যায়, তাদের প্রতিবেদকেরা ১২টি বেটিং সাইট পরীক্ষা করে দেখেছেন। কয়েকটি প্ল্যাটফর্মে মাত্র ১০০ টাকা জমা দিয়েও বাজি ধরা সম্ভব ছিল। টাকা জমা ও উত্তোলনের জন্য ব্যবহারকারীদের এজেন্টের মাধ্যমে মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) ব্যবহার করতে হয়েছে। এ ধরনের ব্যবস্থায় প্রথম দিকে সামান্য জিতলে অনেকেই মনে করেন, কৌশল জানলে নিয়মিত আয় করা সম্ভব। কিন্তু জুয়ার ফলাফল ব্যবহারকারীর নিয়ন্ত্রণে থাকে না। হারানো টাকা ফিরে পাওয়ার আশায় বারবার বাজি ধরতে গিয়ে অনেকে আরও বেশি অর্থ হারান। দ্য ডেইলি অবজারভারের ৭ আগস্টের প্রতিবেদনে ঢাকার এক চা বিক্রেতার অভিজ্ঞতা তুলে ধরা হয়েছে। তিনি প্রথমে ২ হাজার টাকা দিয়ে ১০ হাজার টাকা জিতেছিলেন। পরে আরও বেশি লাভের আশায় পরিবারের দেওয়া ৩ লাখ টাকা হারান। এটি একটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা; তবে এমন ঘটনা দেখায়, অল্প জয়ের অভিজ্ঞতা কীভাবে বড় আর্থিক ঝুঁকির দিকে ঠেলে দিতে পারে। ওয়েবসাইট বন্ধ হলেও নতুন নামে ফিরে আসে কেন? অনলাইন জুয়ার সাইট বন্ধ করা গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু শুধু একটি ওয়েব ঠিকানা বন্ধ করলেই পুরো কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায় না। কারণ এসব প্ল্যাটফর্মের পেছনে থাকে একাধিক ডোমেইন, বিকল্প ওয়েব ঠিকানা, অ্যাপ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রচার এবং অর্থ লেনদেনের নেটওয়ার্ক। একটি সাইট বন্ধ হলে একই চক্র নতুন ডোমেইন বা অন্য ঠিকানা ব্যবহার করে কার্যক্রম চালানোর চেষ্টা করতে পারে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে পুরোনো ব্যবহারকারীদের নতুন ঠিকানায় নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থাও থাকে। ফলে সাধারণ ব্যবহারকারীর কাছে মনে হতে পারে, আগের সাইটটিই আবার ফিরে এসেছে। আমাদের সময় ডটকমের ২০২৬ সালের আগস্টে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে পুলিশের তথ্য উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, ১ মে থেকে ১১ আগস্ট পর্যন্ত দেশে প্রায় ৫৮৬টি অনলাইন জুয়ার সাইট সক্রিয় ছিল। একই প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২১ সালের অক্টোবর থেকে বিটিআরসি অন্তত ৫ হাজার ১০৯টি জুয়ার ওয়েবসাইট এবং ৪৫০টি অ্যাপ বন্ধ করেছে। এই সংখ্যাগুলো দেখায়, ওয়েবসাইট বন্ধের পাশাপাশি এর পেছনের পরিচালনাকারী, অর্থ লেনদেনের ব্যবস্থা ও প্রচার নেটওয়ার্ক শনাক্ত করা কতটা জরুরি। তবে সক্রিয় সাইটের সংখ্যা ও লেনদেনের পরিমাণকে স্বাধীনভাবে নিরীক্ষিত হিসাব হিসেবে ধরে নেওয়া ঠিক হবে না; এগুলো প্রতিবেদনে উদ্ধৃত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্য। টাকার লেনদেন কীভাবে চলে? অনলাইন জুয়ার ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি হলো অর্থ সংগ্রহ ও স্থানান্তর। ব্যবহারকারী কোনো প্ল্যাটফর্মে টাকা জমা দিতে চাইলে অনেক ক্ষেত্রে তাকে নির্দিষ্ট মোবাইল ব্যাংকিং নম্বর দেওয়া হয়। সেই নম্বরে টাকা পাঠানোর পর এজেন্ট ব্যবহারকারীর জুয়ার অ্যাকাউন্টে অর্থ যোগ করে দেন। একজন এজেন্টের কাছে বিভিন্ন ব্যবহারকারীর টাকা জমা হতে পারে। পরে সেই অর্থ অন্য হিসাব বা মধ্যস্থতাকারীর কাছে পাঠানো হয়। তদন্তকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, এভাবে কয়েকটি ধাপে অর্থ স্থানান্তর করে মূল পরিচালনাকারীদের কাছে পৌঁছানো হয়। কিছু ক্ষেত্রে বিদেশে অর্থ পাঠাতে ক্রিপ্টোকারেন্সি ও হুন্ডির মতো ব্যবস্থাও ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের ৪ অক্টোবর ২০২৬-এর এক প্রতিবেদনে সিআইডির তথ্যের ভিত্তিতে অর্থ স্থানান্তরের চারটি স্তরের কথা বলা হয়েছে—জুয়ায় অংশ নেওয়া ব্যক্তি, স্থানীয় এজেন্ট, সুপার এজেন্ট এবং মূল পরিচালনাকারী। প্রতিবেদনে বলা হয়, স্থানীয় এজেন্টরা বিভিন্ন ব্যবহারকারীর কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করে পরবর্তী স্তরে পাঠান। অর্থাৎ, কোনো একটি ওয়েবসাইট বন্ধ করলেই এই আর্থিক নেটওয়ার্ক ভেঙে পড়ে না। এর সঙ্গে যুক্ত হিসাব, এজেন্ট, মধ্যস্থতাকারী এবং অর্থের চূড়ান্ত গন্তব্য শনাক্ত করা না গেলে একই কার্যক্রম অন্য মাধ্যমে চলতে পারে। অনলাইন জুয়ার বিস্তার ঠেকাতে বাংলাদেশে ২০২৬ সালের ১ জুলাই থেকে কার্যকর হয়েছে জুয়া প্রতিরোধ আইন, ২০২৬। নতুন আইনে অনলাইন জুয়া, বেটিং, জুয়ার বিজ্ঞাপন ও প্রচারণা, ভুয়া সিম বা এমএফএস হিসাব ব্যবহার এবং জুয়ার অর্থ স্থানান্তরের মতো বিষয়কে অপরাধ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। আইন অনুযায়ী, অনলাইন বেটিংয়ে জড়িত থাকার অপরাধে সর্বোচ্চ সাত বছর কারাদণ্ড, পাঁচ কোটি টাকা পর্যন্ত জরিমানা অথবা উভয় দণ্ড হতে পারে। জুয়ার বিজ্ঞাপন ও প্রচারণার ক্ষেত্রেও শাস্তির বিধান রয়েছে। কিন্তু আইন থাকলেই অপরাধ বন্ধ হয়ে যায় না। এর কার্যকর প্রয়োগের জন্য প্রয়োজন ওয়েবসাইট ও অ্যাপ শনাক্ত করা, অর্থ লেনদেনের সন্দেহজনক হিসাব অনুসন্ধান, এজেন্ট নেটওয়ার্ক ভেঙে দেওয়া এবং দেশের বাইরে থাকা পরিচালনাকারীদের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা। যুক্তরাজ্যের গ্যাম্বলিং কমিশনের ২০২৬ সালের মার্চে হালনাগাদ করা প্রতিবেদনে দেখা যায়, অবৈধ জুয়া নিয়ন্ত্রণে শুধু সার্চ ইঞ্জিন থেকে লিংক সরানো নয়, ডোমেইন রেজিস্ট্রার পর্যায়ে ব্যবস্থা নেওয়া এবং ভৌগোলিক অবস্থানভিত্তিক প্রবেশ নিয়ন্ত্রণও গুরুত্বপূর্ণ। অর্থাৎ, একটি ওয়েবসাইটের দৃশ্যমান ঠিকানা বন্ধ করার পাশাপাশি সেটি পরিচালনার অবকাঠামোতেও ব্যবস্থা নিতে হয়। শুধু অভিযান নয়, প্রয়োজন সমন্বিত ব্যবস্থা অনলাইন জুয়ার বিস্তার রোধে কয়েকটি বিষয় একসঙ্গে নিশ্চিত করা জরুরি। প্রথমত, শুধু ওয়েবসাইট বন্ধ নয়, এর সঙ্গে যুক্ত আর্থিক হিসাব ও এজেন্ট নেটওয়ার্ক শনাক্ত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জুয়ার বিজ্ঞাপন, রেফারেল লিংক ও প্রলোভনমূলক প্রচারণা বন্ধে কার্যকর নজরদারি প্রয়োজন। তৃতীয়ত, সন্দেহজনক লেনদেন শনাক্ত করতে আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মধ্যে তথ্য বিনিময় বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে ব্যবহারকারীদেরও বুঝতে হবে, অনলাইন জুয়া কোনো নির্ভরযোগ্য আয়ের মাধ্যম নয়। অল্প টাকা দিয়ে বড় অঙ্কের লাভের প্রতিশ্রুতি অনেক সময় মানুষকে এমন এক চক্রে আটকে ফেলে, যেখান থেকে বেরিয়ে আসা কঠিন হয়ে পড়ে। অনলাইন জুয়ার বিরুদ্ধে লড়াই তাই কেবল কয়েকটি ওয়েবসাইট বন্ধ করার বিষয় নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে মানুষের অর্থ, পারিবারিক নিরাপত্তা, তরুণদের ভবিষ্যৎ এবং দেশের আর্থিক ব্যবস্থার সুরক্ষা। যত দিন এই ব্যবসার অর্থ সংগ্রহ, প্রচার ও পরিচালনার নেটওয়ার্ক অক্ষত থাকবে, তত দিন নতুন নামে নতুন প্ল্যাটফর্ম ফিরে আসার ঝুঁকিও থেকে যাবে।


