Full Story
ঘরের তাপমাত্রায় সুপারসলিড  কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞানে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করলেন বিজ্ঞানীরা ।

ঘরের তাপমাত্রায় সুপারসলিড কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞানে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করলেন বিজ্ঞানীরা ।

পদার্থবিজ্ঞানে সাধারণত কঠিন, তরল ও গ্যাস—পদার্থের এই তিনটি পরিচিত অবস্থার কথা বেশি আলোচনা করা হয়। কিন্তু কোয়ান্টাম জগতে এমন কিছু অস্বাভাবিক অবস্থা রয়েছে, যেগুলো প্রচলিত ধারণাকে নতুনভাবে ভাবতে বাধ্য করে। এর মধ্যে অন্যতম সুপারসলিড। এই অবস্থায় একটি কোয়ান্টাম ব্যবস্থা একই সঙ্গে সুপারফ্লুইডের মতো বৈশিষ্ট্য এবং কঠিন স্ফটিকের মতো সুশৃঙ্খল গঠন প্রদর্শন করে। সম্প্রতি বিজ্ঞানীরা বিশেষ আলোক-প্রযুক্তি ব্যবহার করে ঘরের স্বাভাবিক তাপমাত্রায় এমন একটি সুপারসলিড অবস্থা পর্যবেক্ষণ করেছেন। গবেষণাটি আন্তর্জাতিক বিজ্ঞানবিষয়ক সাময়িকী Science Advances-এ ১৬ অক্টোবর ২০২৬ প্রকাশিত হয়। গবেষণায় অংশ নেয় পোল্যান্ডের ইউনিভার্সিটি অব ওয়ারশ, মিলিটারি ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজি, সুইজারল্যান্ডের IBM Research Zurich এবং ফ্রান্সের CNRS-সংশ্লিষ্ট গবেষকেরা। ৩ নভেম্বর ইউনিভার্সিটি অব ওয়ারশ তাদের গবেষণার বিস্তারিত তুলে ধরে। সুপারসলিড আসলে কী? সুপারসলিড বোঝার জন্য প্রথমে সুপারফ্লুইড সম্পর্কে জানা প্রয়োজন। সাধারণ তরল প্রবাহিত হওয়ার সময় সান্দ্রতা বা অভ্যন্তরীণ ঘর্ষণের কারণে বাধার সম্মুখীন হয়। কিন্তু সুপারফ্লুইড এমন একটি কোয়ান্টাম অবস্থা, যেখানে নির্দিষ্ট শর্তে তরলের সান্দ্রতা কার্যত শূন্য হয়ে যায়। ফলে এটি বাধাহীনভাবে প্রবাহিত হতে পারে। অন্যদিকে, কঠিন স্ফটিকের পরমাণু বা কণাগুলো একটি নির্দিষ্ট নিয়মে সাজানো থাকে। সুপারসলিডের বিশেষত্ব হলো, এতে সুপারফ্লুইডের মতো কোয়ান্টাম প্রবাহের বৈশিষ্ট্যের পাশাপাশি স্ফটিকের মতো নিয়মিত ঘনত্বের বিন্যাসও দেখা যায়। অর্থাৎ একই কোয়ান্টাম ব্যবস্থায় প্রবাহমানতা এবং সুশৃঙ্খল গঠন—দুটি বৈশিষ্ট্য একসঙ্গে উপস্থিত থাকে। ১৯৬০-এর দশকেই পদার্থবিজ্ঞানীরা এমন অবস্থার তাত্ত্বিক সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করেছিলেন। তবে পরীক্ষাগারে সুপারসলিড অবস্থার প্রথম সফল পর্যবেক্ষণ হয় ২০১৭ সালে অতি নিম্ন তাপমাত্রায় তৈরি বোস-আইনস্টাইন কনডেনসেটে। সাম্প্রতিক গবেষণার বিশেষত্ব হলো, এখানে আলো ও পদার্থের সংমিশ্রণে তৈরি একটি ব্যবস্থায় ঘরের স্বাভাবিক তাপমাত্রায় এই অবস্থা পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে। কীভাবে ঘরের তাপমাত্রায় এটি সম্ভব হলো? এই গবেষণার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো এক্সাইটন-পোলারিটন নামের বিশেষ কোয়ান্টাম কণিকা। এটি মূলত আলো ও পদার্থের শক্তিশালী মিথস্ক্রিয়ায় তৈরি একটি হাইব্রিড কোয়াসিপার্টিকল। অর্থাৎ এটি সাধারণ আলোককণা বা সাধারণ পদার্থের কণিকা নয়; বরং উভয়ের বৈশিষ্ট্য বহন করে। গবেষকেরা একটি বিশেষ অপটিক্যাল মাইক্রোক্যাভিটি তৈরি করেন। এতে ব্যবহার করা হয় নেমাটিক লিকুইড ক্রিস্টাল এবং MeLPPP নামের একটি জৈব সেমিকন্ডাক্টর পলিমার। এই কাঠামোর মধ্য দিয়ে আলো ও পদার্থের মধ্যে শক্তিশালী মিথস্ক্রিয়া তৈরি করা সম্ভব হয়। এরপর লেজার দিয়ে ব্যবস্থাটিকে উত্তেজিত করে এক্সাইটন-পোলারিটনের ঘনীভবন ঘটানো হয়। গবেষকেরা দেখেন, নির্দিষ্ট অবস্থায় নির্গত আলোর মধ্যে নিয়মিত দূরত্বে উজ্জ্বল রেখা তৈরি হচ্ছে। এই রেখাগুলো কোয়ান্টাম ব্যবস্থার ঘনত্বে স্ফটিকের মতো পর্যায়ক্রমিক বিন্যাস তৈরির প্রমাণ দেয়। আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, প্রতিবার লেজার পালস প্রয়োগের পর রেখাগুলোর অবস্থান পরিবর্তিত হচ্ছিল। গবেষকদের মতে, এটি স্বতঃস্ফূর্তভাবে প্রতিসাম্য ভেঙে নতুন বিন্যাস বেছে নেওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ। একই সঙ্গে তাঁরা আলোর মেরুকরণেও নির্দিষ্ট পর্যায়ক্রমিক পরিবর্তন এবং সুপারফ্লুইড বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে সম্পর্কিত ঘূর্ণি পর্যবেক্ষণ করেন। কেন এই গবেষণা গুরুত্বপূর্ণ? এত দিন অদ্ভুত কোয়ান্টাম অবস্থা নিয়ে গবেষণার বড় বাধা ছিল অত্যন্ত নিম্ন তাপমাত্রা বজায় রাখার প্রয়োজনীয়তা। এ জন্য ব্যয়বহুল শীতলীকরণ ব্যবস্থা ব্যবহার করতে হতো। কিন্তু আলো ও পদার্থের বিশেষ সংমিশ্রণ ব্যবহার করে গবেষকেরা স্বাভাবিক তাপমাত্রায় কোয়ান্টাম বৈশিষ্ট্য অনুসন্ধানের একটি নতুন পথ দেখিয়েছেন। এতে ভবিষ্যতে আলোকভিত্তিক দ্রুতগতির প্রযুক্তি, নিউরোমরফিক কম্পিউটিংয়ের জন্য বিশেষ প্রসেসিং ব্যবস্থা এবং অত্যন্ত সংবেদনশীল অপটিক্যাল সেন্সর তৈরির গবেষণায় নতুন সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। আরেকটি উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, গবেষণায় ব্যবহৃত লিকুইড ক্রিস্টাল মাইক্রোক্যাভিটির বৈশিষ্ট্য বাইরের বৈদ্যুতিক ভোল্টেজ প্রয়োগ করে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। ফলে ভবিষ্যতে গবেষকেরা ইচ্ছামতো এই আলোক-ব্যবস্থার বৈশিষ্ট্য পরিবর্তন করে আরও উন্নত কোয়ান্টাম প্রযুক্তি নিয়ে পরীক্ষা করতে পারবেন। এখনো কি এটি ব্যবহারিক প্রযুক্তি? এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি। বিজ্ঞানীরা নতুন কোনো সাধারণ কঠিন পদার্থ আবিষ্কার করেননি, যা ঘরের তাপমাত্রায় তরলের মতো প্রবাহিত হচ্ছে। বরং তাঁরা বিশেষভাবে তৈরি একটি আলোক-ব্যবস্থায় কোয়ান্টাম পদার্থের সুপারসলিড বৈশিষ্ট্য পর্যবেক্ষণ করেছেন। এটি এখনো পরীক্ষাগারভিত্তিক গবেষণা। বাস্তব কম্পিউটার, বাণিজ্যিক সেন্সর কিংবা দৈনন্দিন প্রযুক্তিতে এর ব্যবহার শুরু হয়ে গেছে—এমন কোনো দাবি করার সুযোগ নেই। এসব সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে আরও গবেষণা, প্রযুক্তিগত উন্নয়ন ও পরীক্ষা প্রয়োজন। তবে এই গবেষণার গুরুত্ব হলো, কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞানের জটিল কিছু বৈশিষ্ট্য অনুসন্ধানের জন্য অত্যন্ত নিম্ন তাপমাত্রার ওপর নির্ভরতা কমানোর একটি নতুন পথ তৈরি হয়েছে। ভবিষ্যতের আলোকভিত্তিক কোয়ান্টাম প্রযুক্তি উন্নয়নে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। সব মিলিয়ে, সুপারসলিড নিয়ে এই গবেষণা শুধু পদার্থের অদ্ভুত একটি অবস্থা পর্যবেক্ষণের ঘটনা নয়; বরং স্বাভাবিক তাপমাত্রায় কোয়ান্টাম প্রযুক্তি নিয়ে গবেষণার নতুন সম্ভাবনার দরজাও খুলে দিচ্ছে। AR News — খবর, তথ্য ও বিশ্লেষণ।

Posted by: Abdul Rohim